Wednesday, 7 July 2021
অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে
নীলার ভালোবাসা
হঠাৎ ভালোবাসার ছোঁয়া
Tuesday, 6 July 2021
কামনা
কামনা
সান্ত্বনা চ্যাটার্জী
আয়নায় নিজেকে আর এক বার দেখে নেয় আরতি । কি নেই তার মধ্যে যে কিছুতেই সে অজিতের মনের মানুষ উঠতে পারছেনা । বিয়ের পর দিন থেকেই সে তার প্রাণ মন দিয়ে অজিত কে ভালবাসতে চেষ্টা করেছে, হয়ত পেরেছে ও কিছুটা কিন্তু অজিত, কেন অজিত এমন ছাড়া ছাড়া থাকে ! তার কি অন্য কোনও প্রেয়সী আছে, বা অন্য কোনও মেয়ে মানুষ, নয়ত এমন ব্যবহার কেন?
বাবা মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করেছে অজিত ;বাধ্য হয়ে ভুলে যেতে হয়েছে তার প্রথম প্রেম মানসীকে, তার মনের মানুষ মানসী । মানসীর জন্য পৃথিবীর সবার সঙ্গে লড়তে পারত অজিত, কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে কি করে যুদ্ধ করবে। মাত্র তিন দিনের অজানা জ্বরে মারা গেছিল মানসী আজ থেকে তিন বছর আগে। পৃথিবী থেকে মুছে গেলেও, অজিতের মন থেকে কেউ সরাতে পারবেনা তার মানসী কে , কেউ না আর তাই নিজের বৌয়ের বিরুদ্ধে এক অযৌক্তিক বিদ্বেষে তার মন ভরে থাকে।।
অজিত কাগজের থেকে চোখ না তুলেই ডাকে- মায়াদি, এক কাপ চা দাও না।
দূর থেকে সারা আসে এই দিচ্ছি দাদাবাবু ।
উঃ অসহ্য , মনে মনে ভাবে অজিত । সারি, গয়না, সাজ গোজ, আর টেলিভিশনের প্যান প্যানে ধারাবাহিক, এর বাইরে কোনও জগত নেই তার বৌ এর। এই যে দেশে এত বড় ঘটনা ঘটল, বিজেপি এত বছরের দল জাতীয় কংগ্রেস কে গো হারান হারাল, কোনও অভিব্যক্তি আছে তার জন্য। শুধু মাত্র একটা সুন্দর শরীর ।
বৌ কে নিয়ে ‘শব্দ’ দেখতে গেছিল অজিত, মাঝ খানেই আরতি বলে ওঠে, এ কি সব দেখাচ্ছে বলত, শুধু নানা রকম শব্দ । সেদিন থেকে অজিত প্রতিজ্ঞা করেছে আরতি কে নিয়ে আর সিনেমা দেখতে যাবেনা, যেতে হলে নিজে একা যাক পাগলু, খোকা চারশো বিশ। নিজের চেনা জগতের বাইরে ও যে কোনও জগত থাকতে পারে, ভাবনার চিন্তার নিজের ভিতরের মানুষটাকে জানার, এ সব আরতির জগতে নেই । দেহ সর্বস্ব মেয়ে মানুষ। মোটা পাছা আর ভারি বুক আর একটা সুন্দর মুখ নারী কে আকর্ষণীয় করে তোলেনা এটা বোঝেনা কেন কে জানে।
চা শেষ করে চটিতে পা গলায় অজিত । কোথায় যাচ্ছ ?
হাঁটতে, কেন ?
একটা ওডিকলোনের শিশি এনো না গো বাবুর দোকান থেকে ।
ঠিক আছে ।
বেশ রাত করে ফেরে অজিত , তার খাবার সাজিয়ে বসে আছে আরতি।
খাওয়া শেষ করে কিছু ক্ষণ খবর শোনে অজিত তার পরে শুতে যায়।
রোজকার মতন আজও খবর চালিয়ে বসল টিভির সামনে । এ সময়
আরতি , রাতের প্রসাধন সারে, চুল বাঁধে, গায়ে গন্ধ মাখে । তার পর বিছানায় অপেক্ষা করে । অজিত খবর শুনে, হাত পা ধুয়ে শোবার ঘরে ঢোকে। আজ ঘরে একটা চাপা ওডিকলোনের গন্ধ, সদ্য কিনে এনেছে অজিত দোকান থেকে ।
ঘরের আলো নেভানোই ছিল । পাজামার দড়ি আলগা করে খাটে ওঠে অজিত,
পাশে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় উদগ্রীব আরতি । সেই নরম গরম লোভনীয় শরীরের আহ্বান অবজ্ঞা করার শক্তি তার নেই। চাপা গালাগাল দিয়ে শরীর নিয়ে খেলা শুরু করে। ক্রমশ ঘৃণার নারী তে প্রবেশ করে সে আর তার প্রতি রোম রোম কামনা আর সুখে কাঁপতে থাকে ।ক্রমশ আরতির শীৎকার ও চাপা গোঙ্গানি আর অজিতের শরীরের ওঠানামা শেষ সীমায় এসে থেমে যায়।
অজিত উঠে একটা সিগারেট ধরায়, ঘৃণা ঘৃণা আর ঘৃণা করে সে নিজেকে আর আরতি কে।
এ ই কাম তাকে প্রতি রাতে হারিয়ে দেয় ঘৃণার মেয়ে মানুষটার কাছে ।
আজ থেকে কথা বলবো
কোভিড--19
কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে
সকালে উদগ্রীব এসে ঘুমের থেকে জাগিয়ে তুললো তপস্তুভ কে। "কিরে, উঠিস নি এখনো? যাবিনা রুদ্রান্তদের ওখানে?" কম্বল সরিয়ে উঠে বসে বিস্ময়ের মুখে তপস্তুভ বলে,"কেন, কি আছে আজ ওখানে?"
"ওমা, সেকি, তুই জানিস না? আজ না কবি শ্যামলতনু তন্তুবায়ের আসার কথা!"
"কে শ্যামলতনু?"
"সত্যি মাইরি! তুই না কোনো খোঁজখবরই রাখিস না!"
"আরে অত ভনিতা না করে বলনা।"
"আরে গান্ডু, শ্যমলতনু হচ্ছে এখন সেই লোক যার হাতে প্রচুর ক্ষমতা ! রাজ্যের কবিদের অন্যতম আরাধ্য এখন উনি।"
"সেটা কিরকম?"
"আরে গাধা, আমরা যারা এদিক থেকে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা পাঠাই, সেগুলির প্রকাশের দায়িত্বে তো এখন উনিই থাকেন! উনার হাত থেকে বেরোলে তবেই সেটা ছাপা হবে। আর একবার কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা বের হলে তো বুঝতেই পারছিস!"
"ও, তাই নাকি? তা হঠাৎ রুদ্রান্তদের ওখানে উনি আসছেন কেন?"
"আরে, রুদ্রান্তর বেশ কয়েকটা কবিতা বেরিয়েছে না কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে ! ওর সাথে তো উনার খুব ভালো সম্পর্ক এখন। তা উনি দার্জিলিং গেছিলেন, তাই ফেরার পথে এখানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তাই তার সৌজন্যে রুদ্রান্তদের ওখানে আজ একটা সাহিত্য আসর। সবাই যাচ্ছে। চল, যদি যোগাযোগ করে কিছু একটা করতে পারা যায়!"
তপস্তুভ নিজেও কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠিয়েছে, কিন্তু ছাপেনি। ও জানে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে একবার কবিতা ছাপা হলেই এদিককার কবিরা জাতে উঠে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে মানে কি, প্রকৃতপক্ষে সবাইই। একমাত্র তপস্তুভ ওসব ভাবেনা। তবে এদেরকে দেখানোর জন্য ও নিজেই বাইপোস্টে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে চার পাঁচটি কবিতা পাঠিয়েছিল। ছাপেনি। ভেতরের গল্প যে এতকিছু, তা তো অতটা সে জানেনা। তপস্তুভ এখানে যারা যত লেখে তাদের সবার চাইতে ও বেশ অন্যরকম। বাংলা কবিতার বিবর্তনের ধারা বুঝে ও আগামীর কবিতাই এখন লিখছে। ওর খিদেটা অন্যরকম। যাইহোক, ভদ্রলোককে দেখে আসার জন্য না হয় সে যাবে। যথারীতি দুপুরে খেয়েদেয়ে, জিন্সের প্যান্টের উপর একটা গেঞ্জি গায়ে সাইকেল নিয়ে তপস্তুভ বেরিয়ে পড়ে। লেখার ডায়েরি নিল না। মোবাইলেই দু চারটে লেখা আছে, আর স্বরচিত অনেক কবিতা ওর স্মৃতিতেই থাকে। প্রয়োজন হলে পড়বে, না হলে পড়বে না। ও তো যাচ্ছে এখানকার কবিকূলের হ্যাংলামোপনা দেখতে আর ব্যাপারটা কি সেটা এনজয় করতে।
রুদ্রান্তদের ওখানে আজ সিঁড়িতেই যত চটি জুতো দেখা যাচ্ছে, হলঘর যে ভিড়ে ঠাসা ও বেশ বুঝতে পারে। বসল গিয়ে শেষের এক বেঞ্চিতে। ততক্ষণে ব্যক্তিপূজোর সমাপ্তি ঘটে গেছে। লোকাল কবিদের পড়াও প্রায় শেষ। তপস্তুভকে পেছনে বসতে দেখে একজন বলেই উঠলো, আরে ওই তো তপস্তুভদা এসে গেছে, ওর কবিতা শুনি এবার। তপস্তুভ বড় অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে জানায় তার আজ শরীরটা ভালো নেই। সে শুধু দেখতে এসেছে, কবিতা সঙ্গে আনেনি। শ্যমলতনু বাবুর কথা ও কবিতা শোনাতেই ওর আগ্রহ বেশি। অগত্যা শ্যামলতনু তন্তুবায়ের সমাপ্তি ভাষণ ও কবিতা পাঠ। শ্যামলতনু বাবু এখানকার কবিদের লেখালেখির জন্য আরো উৎসাহ দিয়ে বেশ কিছু সুপরামর্শ দিয়ে কবিতা পাঠ শুরু করলেন। তপস্তুভ অবাক হয়ে শুনতে থাকে। শ্যামলতনু বাবুর প্রতিটি কবিতাই ওর খুব চেনা চেনা লাগে। মনে হয়, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইতো, এর পরের শব্দটা এরকমই হবে। এই তো এরকমই সে কয়েকটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিল কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে। কবিতা পড়ার পর সমবেতদের সেল্ফি তোলার উৎসাহের ভিড়ে হারিয়ে যান শ্যামলতনু বাবু। তপস্তুভ ততক্ষণে সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথে, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় সে, আর কোনো দিন কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বা কোথাও আগাম কবিতা পাঠাবে না। তেমনভাবে কেউ না চাইলে কোথাও ওর লেখা আর দেবে না। শুধু নিরলসভাবে ও লিখে যাবে।
Monday, 5 July 2021
ঘাম
ঘাম
____
জয়িতা ভট্টাচার্য
রতনে রতন চেনে কথাটা ভয়ানক ভাবে সত্য।অন্তত পটাশপুর ৪নং গ্রাম পঞ্চায়েত এর শিখণ্ডিপাড়ায় ত বটেই।
এ হেন নামই বা এলাকাটির কে রেখেছিলো আজ আর জানার উপায় নেই তবে কার্যকারণে যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়।
রতন সেন শক্তিশালী নেতা তার অট্টালিকার বারান্দায় বসে দার্জিলিং চায়ের সঙ্গে ফুলকো লুচিসহ আলুরদম খেতে খেতে একথাই ভাবছিল।এমনিতে গ্রামটা বেশ সুন্দর।ছোটো ছোটো বাড়ি,মাটির বা টালির একটা দুটো একতলা পাকা ঘর,মাটির রাস্তা এবড়োখেবড়ো, কাঁচা নয়ানজুলি আর বট অশত্থ সজনে আরো কত গাছ।একটা গ্রাম ত এমনই হবার কথা।
পয়সা নষ্ট সে হতে দেয়নি।পাকা সড়ক,ড্রেন,ইত্যাদি গ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করে।বাড়িটা তাই আড়ে বহরে বেড়েছে।বছর বছর রং।ঝকঝকে।শুধু......শধু ওই পথের বাঁকে রতন কামারের দোকানটা.....।সব সময় ভিড়।আড্ডা।আলোচনা।শুনেছে রতন হরেক রকম আরো কাজ করে।
এ গ্রামে তাই রতন বলতে কামার কে বোঝে প্রথমত লোকে তারপর রতনবাবুর খোঁজ মানে রতন সেন।ব্যাপারটা যারপরনাই বিশ্রী।
হাঘরের বেটা।ছোটোলোক যেমন হয়।করিস ত কামারের কাজ।বামন হয়ে চাঁদে হাত..........
___"দাদা নীচে লোক অপেক্ষা করছে।আজ আপনার কান্তাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির বৈঠক"
__" তারপর?"
__"দাদা ওটা যেতে আসতে তিনটে হয়ে যাবে।বিকেলে মাঠে যেমন বসেন.....দু চারটে কেস আছে ওগুলো...."
__"ওঠো দেরি হয়ে। যাবে চা আর বাসি রুটি দুখান খেও।"
বউ বাবুর বাড়ি কাজে চলে যায়।
রতন জেগেছে অনেক্ষণ।ভাবছে।অনেক কিছু ভাবছে।কূলকিনারা নেই তার।বাইরের কুয়াশা মনে ছেয়ে আছে ।পুকুর থেকে স্নান করে সব সেরে দোকান খোলে।তার দোকান সবার আগে খোলে।
তারপর হাঁপরে পিটতেই থাকে।আগুনটা জ্বলে ধিকি ধিকি।হাতুড়ির ঘা।কাস্তে কুড়ুল দা পড়ে আছে। সকালের খদ্দেরের চেয়ে রাতের খদ্দের বেশি ইদানিং।
মাঠের পাড়ে সালিশি সভা।ভিড় যেন পাতলা? লোকের কি সমস্যা কমে গেলো? ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ,স্বামী স্ত্রী ঝগড়া,জমি দখলের লড়াই এসবের বিচার করে রতন।তার সাগরেদ রা কড়া নজর রাখে।
আজ মোটে দুটো ঘর এলো।সালিশি শেষ করে রতন নন্দার বাড়ির দিকে পা চালায়। ওরা কি রতনের দোকানে গেলো?
রতন কামারের হাত শক্ত ,দাগ আর ফোস্কা।
মা-টা মরে একদিকে তার ভার কমেছে।বোনটার কথা মনে পড়লে চোয়াল শক্ত,হাতের পেশি ফুলে ওঠে।কামারপাড়ার দিকে যেতে যেতে মুখোমুখি হয় অন্ধকারে একদিন রতনবাবুর।পাশ দিয়ে চলে যান হন হন করে।আজও বলা হলো না বন্ধকের জমিটার কত দেনা আর বাকি। পেছন পেছন কিছুটা ফিরে যায় লোকটাকে ধরার জন্য।
রতনের হঠাৎ বুকটা ধড়াস।ছোটোলোকটার চোখ দুটো কেমন জ্বলছিলো।নাকি তার মনের ভুল।পেছনে পায়ের শব্দ।ওই ত আসছে রতন কামার।পেছু নিয়েছে।এদিকটা ঝোপঝাড় বিশেষ বসতি নেই।যদি হাতে দা থাকে আর ......ছুটতে থাকে রতন বিপুল শরীর নিয়ে।
এসি চলছে।ডাক্তার এসেছে।কদিন শরীরটা ভালো নেই।চোখ লাল।প্রেশার বেড়েছে।
ঠং ঠং ঠং..রোজ ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়ে শব্দটা
তাঁর বুকেই যেন হাতুড়ি পেটে । বারান্দায় যাওয়া বন্ধ। গেলেই মনে হয় পথের বাঁকে দু জোড়া জ্বলন্ত চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ও কি জেনে ফেলেছে জমিটার দেনা কবেই শোধ হয়ে গেছে ,নিজের নামে বেদখল করে নিয়েছে সে.....অথবা পনের বছর আগের সেই আত্মহত্যা... রতনের বোন রত্নার!
পেটে ত তারই...
নিজেকেই বিড় বিড় করেন সামনে নির্বাচন কিবা করার ছিলো।কামার বস্তির ছোটোলোকের মেয়ে.....এসব সম্পর্ক পাবলিক নিত না।
ক্রমশ কৃশ হতে থাকেন রতন। ক্রমশ আরো জোরে পড়ে আগুনে হাঁপর।
পুজো আসছে।
রতনবাবুর বড়ো পুত্র তৈরী হয়।সিটটা তার ন্যায্য দাবী।রতন কাউকে বলতে পারেন না তাঁর আতঙ্কের কথা।
দিনরাত আজকাল স্বপ্ন দেখেন অট্টালিকা নেই তিনি কামার হয়ে গেছেন,জমিহীন...
মহালয়ার পরদিন হাতুড়ির চরম ঘা পড়লো অবশেষে।
এলাকার নেতা ও সমাজসেবী রতন বাবুর মৃত্যুতে বিরাট মিছিল,শোকের বিজ্ঞাপন।
রতন কামারের দোকানের সামনে দিয়ে শবযাত্রা চলে যায়।কিছু খই উড়ে আসে তার দিকে।
পাথরে কোঁদা কালো শরীরে পেশিগুলো ওঠে নামে। মুখে, কপালে ঘাম। ঘাম গড়িয়ে পড়ে নগ্ন লোমশ বুকটা বেয়ে।
ঠং ঠং ঠং ঠং...
শব্দটা বন্ধ হয় না।
মদনের প্রেম
মদনের প্রেম
তাপসকিরণ রায়
মদনের মন আছে বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলেও বিবাহ বন্ধন তাকে বাঁধতে পারেনি। মনের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরটাও নাকি এমন তর নিষ্পাপ ছিল।
মালতি বলেছিল, এত ভালো ছেলে আজকাল মানায় না গো !
মদন বলেছিল, বিয়ের আগে নায়িকাকে চুমু খাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না--
এত আলতো স্বভাবের মানুষটা প্রেমের উপযুক্ত নয়, ভেবে মালতি মদনের সঙ্গ ছেড়ে ছিল।
প্রমা এল, সুন্দরী মেয়ে দেখে মদনই এগিয়ে ছিল। বলেছিল, প্রমা তুমি খুব সুন্দরী গো !
--কেমন ? হেসে প্রশ্ন করেছিল প্রমা।
--তোমায় দেখলে বেশ সতীলক্ষী বলে মনে হয়--
প্রমা আর এক পা-ও এগোয় নি, মদনের ভাষা একেবারেই জুতসই বলে তার মনে হয়নি। এই যে আদ্দিকালের এক বুড়ো হাবড়া !
তারপর স্মৃতি এলো, প্রেম চলছিল বেশ, স্বভাবে চলনে-বলনে অনেকটাই মদনের ধারেকাছ ঘেঁষা বলে মনে হয়েছিল। সেখানেও বাঁধ সাধলো, একদিন আবেগের বশে স্মৃতি মদনের হাত ছুঁয়ে দিয়েছিল। মদন সঙ্গে সঙ্গে তিড়িং করে পিছ-পা একটা লাফ দিয়ে মুখ কেটে বলেছিল, এমন ছোঁয়া-ঘাটা মেয়ে আমার একদম পছন্দ নয়।
না, এমনটা চলবে না, তার চেয়ে গ্রামের মেয়ে হোক--হোক না সে আদিবাসী মেয়ে। সেও ভালো হবে অন্ততপক্ষে অচ্ছুৎ হবে। পবিত্র হবে, মাটির গন্ধ মাখা একটা মেয়ে হবে সে। হতে পারে মদনের মত আইবুড়ো ছেলের উপযুক্ত পাত্রী কিংবা প্রেমিকা।
আদিবাসী মেয়েটার নাম ছিল বুদনি। আদিবাসী মেয়ে হলে কি হবে, কালো হলেও সুন্দরী, আয়তো চোখে যখন মদনের দিকে সে তাকিয়ে আধগাল হেসেছিল, ব্যাস তখনই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল মদন।
এক চাঁদনী রাতে ওরা প্রাক-বিবাহের দৃষ্টি বিনিময়ে হাজির হয়েছিল এক কদম্ব গাছের তলে। আবেগের বশে বুদনি বারবার মদনের গা ঘেঁষার চেষ্টা করছিল কি ? মদন সরে যাচ্ছিল, কিন্তু বুদনির গায়ের গন্ধ তার ভালো লাগছিল। আহা মাটির গন্ধ, উগ্র নয়, সবে যেন বছরের প্রথম ক'ফোটা বৃষ্টি ঝরে পড়েছে গ্রাম্য মাটিতে।
গাছের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে দূর দিগন্তের এক ফালি চাঁদ বারবার ঝিলিক মেরে যাচ্ছিল। মদন মনে মনে ভাবছিল, কি মায়াময় এই পৃথিবী--এ যেন রাধা-কৃষ্ণের মিলন--এটুকু ভেবে মদন থেমে গেল, আসলে এমন প্রেম যে সে চায় না। রাধা কৃষ্ণের প্রেম বড় গা-মাখামাখি প্রেম ছিল। সে জানে, সব সময় স্পষ্ট কথা বলা যায় না, আসলে দেব-দেবতাদের ক্ষেত্রে এ সব লীলাখেলা, কিন্তু মানুষের বেলায় চরিত্রস্খলন ছাড়া আর কি কিছু বলা যায় !
এদিকে বুদনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে চলেছে, ও চাঁদ, তুমি আমারে কতবার ছুঁইছো, তাই তো আমার এই কালো রং এত গোরা হইছে গো !....
মদন ভাবছিল, আকাশের চাঁদের সঙ্গে বুদনি প্রেম করতেই পারে--বুদনির মত সহজ সরল মেয়ের প্রকৃতির সঙ্গে প্রেম করা মানায় বটে !
এক সময় বুদনি কেঁদে ওঠে, আকাশের চাঁদের এত দূরত্বের বিরহে বুধনি বুঝি বিরহী হয়ে উঠেছে...এক সময় বুদনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে….
মদন বুদনির দিকে এগিয়ে যায়, একহাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে সান্ত্বনার সুরে বলে ওঠে, কেঁদো না মেয়ে, ও চাঁদ তোমায় কোন দিন ছেড়ে যাবে না--
বুদনি বলে, না গো, সে চলে গেছে, আমার প্রেমের চাঁদ আমারে ছেইড়ে চলে গেছে--
মদন আঁতকে উঠল। এ কি শুনছে সে ! বুদনির প্রেমিক ছিল ? মদন বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে দিকভ্রান্তের মত ছুটে চলেছে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে একবার সে উঁকি মেরে দেখল, আকাশের এক কোণের সেই মরা চাঁদটাও এখন আর নেই।
সমাপ্ত
নিরালায় একা...
নিরালায় একা...
........................
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
চোখ খুলতেই বর্ষার ঘোলা রঙের আকাশ মনখারাপ করাতে এল! মনে পড়ল আজ যে আমার জন্মতিথি!
ততোক্ষণে ভরা বর্ষায় কালিন্দীর জল থইথই করেছে। থেকে থেকেই আকাশ ছিঁড়ে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ।
আজ পথ ঘাট সব জনহীন।
.....
দূরে সশব্দে একটা বাজ পড়ল। যেন ভেঙে গেল একটা কল্পনার
দেওয়াল। তারপর স্পষ্ট দেখলাম একজন নারীকে।
সে বোধহয় সদ্য বিবাহিতা তবুও ইতিমধ্যেই সন্তানবতী যেন! তার কোলের মধ্যে কাপড়ে জড়ানো একটা মানবসন্তান। আহা! ঠিক যেন একগোছা ভোরের শিউলি ফুল।
মেয়েটি এক হাতে আঁজলা করে ফুল গুলো এবার তার চারিদিকে নিয়ে ছড়িয়ে দিল।
যেন এই বিশ্বচরাচরে তার আর নিজের বলে কিছুই রইবে না অথচ সব কিছুতেই সে থেকে যাবে।
সেটাই তো আসল শিক্ষা যা সে দিতে চায় তার ভাবী প্রজন্মকে।
এবারে দেখলাম হঠাৎ মেয়েটি আমার কানে কানে এসে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল, "ময়া তত্যমিদং সর্বং জগদব্যাক্তমূর্তিনা/মৎ স্হানি
সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্হিতঃ"
তার মানে এই যে আমি সবেতে থাকব অথচ সর্বভূতে মানে জগৎবিশ্বে আর আমার নিজের বলে কিছুই থাকবে না....?
দেখলাম এবারে আমার তন্মধ্য ঘুমঘোরটাও যেন ভেঙে গেছে।
............
২১শে আষাঢ়, ১৪২৮.
হিংস্র থাবায় আহত মন
হিংস্র থাবায় আহত মন
রূপা বাড়ৈ
গভীর রাত, চারিদিকে নির্জনতা, আশেপাশে সকলে ঘুমে বিভোর। ঘুমের ঘোরে থাকা চন্দ্রা কি যেন একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে হঠাৎ জেগে যায়, শুয়ে থাকা থেকে উঠে বসে। অন্ধকার বিছানার চারিদিকে দু'হাতে হাতড়িয়ে তার একমাত্র ছোট্ট সন্তানকে খোঁজে। হাতের নাগালে না পেয়ে আলো জ্বালিয়ে দেখে সন্তান তার বাবার বুকের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে আছে। নিশ্চিন্ত হলো, কিন্তু কিছুতেই তার আর ঘুম আসছে না। তাই ব্যালকনিতে গিয়ে আঁধারিয়া প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখছে আর পায়চারি করছে। অর্ধ চাঁদ আকাশের গায়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, আর সেই আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে গাছের কালো কালো পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। অবাক করা পরিবেশ, চন্দ্রার কেনো যেন মনে হচ্ছে, প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে। মনের অজান্তেই ঘর থেকে চন্দ্রা বাহিরে বেড়িয়ে আসে। কিছুটা পথ হেঁটে মেইন গেটের কাছে যেতেই তার কানে একটা শব্দ আসে, মনে হচ্ছে দুজন লোকের ধস্তাধস্তির শব্দ।
চন্দ্রা গেট খুলে দেখে তার পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী বৃদ্ধ কাকা তার নাতনিকে খুব মেরে চলেছে কিন্তু মেয়েটি শব্দ করতে পারছে না মার খেয়ে যাচ্ছে মুখ বুঝে। কারণ মেয়েটির মুখ কাপড়ে বাঁধা। মেয়েটি দৌড়ে এসে চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে বাঁচাও আমাকে মেরে ফেলবে। চন্দ্রাকে দেখে বৃদ্ধ থতমত খেয়ে বলে বড্ড অবাধ্য মেয়ে তাই শাসন করছি, চন্দ্রা তুমি ঘরে যাও।
একটা ছোট্ট কোদাল দিয়ে মেয়েটিকে মারছিলো, রেগে গিয়ে চন্দ্রা বৃদ্ধর হাত থেকে কোদাল'টা কেড়ে নিতেই বৃদ্ধ চন্দ্রার উপর ক্ষেপে যায়। এই শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ী থেকে একজন প্রতিবেশী কাকী বেড়িয়ে এসে বলে উনি আরো অনেকবার এই মেয়েটিকে মেরেছে আমি তার সাক্ষী তবে ওনার ব্যবহার এতো খারাপ যে আমি প্রতিবাদ করতে সাহস পাই নাই। দুজনে এই কথা বলতে বলতে চন্দ্রার বড় বোন এসে বলে তাকিয়ে দেখো বৃদ্ধ জোর করে রক্তাক্ত মেয়েটিকে একটা বড় বালতির মধ্যে ঢুকাচ্ছে। তিনজনে মিলে বৃদ্ধ'কে বাধা দিতে থাকে এমন সময় রাতে টহলকারী পুলিশের গাড়ি সামনে এসে থামিয়ে দেয়। তারা মেয়েটিকে উদ্ধার করে, এরপরে সকলের কাছে থেকে কিছু ঘটনা শুনে বৃদ্ধ'কে গাড়িতে তোলে। মেয়েটি সহ ওখানে উপস্থিত সকলকে গাড়িতে উঠে বসতে বলে। এর মধ্যে আশেপাশের অনেকেই আসে, চন্দ্রার স্বামীও আসে, সকলে সবকিছু জেনে হতভম্ব হয়ে যায়।
পুলিশ প্রথমে একটা ক্লিনিকে মেয়েটিকে চিকিৎসা করায়, তারপরে থানায় নিয়ে মেয়েটির কাছে থেকে বিস্তারিত শোনে। লোমহর্ষক কাহিনী শুনে সকলে তাজ্জব হয়ে যায়। ৭০ বছরের দাদাভাই তার প্রতি কি নির্মম অত্যাচার করেছে দিনের পর দিন। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বিস্তারিত বলতে থাকে, তার নিজের বাবা মারা যাবার পর দুই বছর আগে এই বৃদ্ধর ছেলেকে বিবাহ করে তার মা ৬ বছরের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ২য় স্বামীর ঘরে এসে সংসার করে।
এই দুই বছর ধরে মেয়েটি দাদাভাই'র ঘরে আলাদা খাটে ঘুমায়, কিন্তু প্রায় প্রতিরাতে বৃদ্ধ মেয়েটিকে বলাৎকার করে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলেই মার খায়, এভাবে দিন দিন অত্যাচার বেড়েই চলে, মা'কে বললে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে। এতোদিন চাপা দিয়েছে যেন মা বুঝতে না পারে, কিন্তু এক মাস হয় প্রায় রাতে বাহিরে এনে খুব বেশি করে মেরে ঘরে নিয়ে বলাৎকার করে। আজ বলেছে মেরে গুম করে দেবে, কেউ টের পাবে না, তাই এই ছোট্ট কোদাল দিয়ে কুপিয়েছে। লোকজন না এলে হয়তো মেরেই ফেলতো, এই বলে মেয়েটি আর কিছু বলতে পারে না শুধু কেঁদেই চলেছে।
পুলিশ অফিসার সব শুনে চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বললো আপনাকে স্যালুট, এমন মানবিক মানুষের এখন খুব বেশি দরকার। এই সমাজের শরীরে লেগে থাকা কলুষিত দাগ মুছতে, কালিযুক্ত অসভ্য মানব চরিত্রকে সভ্যতায় ফেরাতে আর এই হিংস্র থাবা হতে নতুন প্রজন্ম'কে বাঁচাতে এমন প্রতিবাদী ইচ্ছাশক্তির মানুষ প্রয়োজন। আবারও বলছি, আপনাদের মতো এমন হৃদয়ের মানুষ খুব প্রয়োজন প্রকৃতির মতো সুন্দর সমাজ গড়তে। এসব বলার পর পুলিশ অফিসার একটি ডাইরি এগিয়ে দিয়ে বললেন কিছু নিয়ম পালন করতে হয় বলে এই ডাইরিতে লিখে দিয়ে যান বিস্তারিত ভাবে পূর্ণ ঘটনা ঐ সময়ে আপনাদের সম্মুখে কি ঘটেছিলো। আপনারাই প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী।
সম্পূর্ণ ঘটনা লিখতে লিখতে দেখা যায় মেয়েটির মা বাবা থানায় চলে এসেছে, মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে তার মা হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে আর তার ২য় বাবা পুলিশ অফিসার'কে বলেন- আমার খুব লজ্জা হচ্ছে এমন জঘন্য অপরাধকারীকে বাবা বলে স্বীকার করতে। তারপরেও বলছি এই অপরাধের জন্য তার যথাযথ বিচার হোক, বলেই কেঁদে ফেলেন। অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে থানা থেকে সকলে চলে যায়। রিমান্ডে বৃদ্ধ অকাতরে সব স্বীকার করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে
অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে-- মানুষের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়ে বোধহয় তৈরি হয় গল্প। অবশ্য শুধু মানুষকে নিয়ে কেন, প্...








