Wednesday, 7 July 2021

অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে

 


অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে--

মানুষের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়ে বোধহয় তৈরি হয় গল্প। অবশ্য শুধু মানুষকে নিয়ে কেন, প্রকৃতির মাঝে যা কিছু আছে এই আকাশ-বাতাস, মাটি-জল, রোদ-ছায়া, আলো-অন্ধকার সব, সব কিছু মিলিয়েই তৈরি হয় গল্প। গল্পকে ছোট, সংক্ষিপ্ত করে, ক্ষুদ্রকায় করে তৈরি হয় অণুগল্প।

গল্প প্রবাহের মাঝেই আবার অনেক গল্প হারিয়ে যায়। পাঠকদের ভাবনার সুযোগ করে দিয়ে গল্পের ঘটনাক্রমকে কখনও কখনও পথ হারাতে দেখা যায়। অনেক ভাবনার সুযোগ রেখে গল্প শেষপথে শেষ হয়ে যায়। তা বলে এধরণের গল্পকে অসম্পূর্ণ বলা যাবে না।

ঘটনাস্রোত নদীর মতই প্রবহমান। এখানেও সুখ-দুঃখের ঢেউ ওঠে। ঘটনা আবর্তে জোয়ার ভাটা চলে। কখনো আবার নদী ফুলেফেঁপে নিজের দু'কূল ভাসিয়ে এগিয়ে চলে। মানুষের জীবনও বুঝি অনেকটা সে রকম। আতিশয্য, মনের অহংকার মানুষকে সংজ্ঞাহীন করে তোলে। কখনও নদী ও তার হিংস্র আস্ফালন মানব সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। আমরাও আমাদের বর্তমান সভ্যতাকে পার করে ক্রমশ এগিয়ে চলি আগামীর অভ্যুত্থানের দিকে। জীবনের স্থির অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে মানুষের মননশক্তি এগিয়ে যায়। মন বড় অস্থির, সে সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে থাকতে চায়। কর্মকে ধর্ম মেনে নিয়ে সৃষ্টিকে আরো সুন্দর সহজ সুলভ করে তুলতে অনুশীলন চলেছে আবহমানকাল ধরে। অবসর সময়ে জীবন অনেকটা শান্ত-শুদ্ধশীল হয়ে ওঠে, সাহিত্যচর্চার নিবেদনে তথা বিনোদনে এই সময়টাই বুঝি হয়ে ওঠে প্রশস্ত এক সময়।

আসলে আমাদের জীবনটা তো একটা বইয়ের মত। বন্দী মলাটের দেয়ালে ঘেরা। মানুষটাকে তার ওপরের চেহারায় কতটুকুই বা আমরা খুঁজে পাই ? তাকে চেনা জানার আকাঙ্ক্ষায় মলাট সরিয়ে তাকে পড়ে নিতে হয়। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণা থেকে যায়। সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় গ্রীষ্ম দাবদাহে তা তো শুকিয়ে যেতেই পারে। তবু কিন্তু সে মরে যায় না, তার মধ্যে সৃষ্টির শেষ অংকুরটুকু বেঁচেই থাকে, কোন গভীরে, গহনে। এমনি সুপ্ত প্রবাহমান ভাবনাটাকে একটু উস্কে দেবার চেষ্টা করতে পারলে হয়ত সৃষ্টি আবার আলোড়িত হয়ে উঠতে পারে। সাহিত্যধারাকে উজ্জীবিত করে তুলতে আমাদের জনগনমনর জাগরণ যে অনিবার্য। সভ্যতাকে উন্নততর করে দিকদর্শন করতে পারে আমাদের এই সাহিত্য উচ্চারণ, সহস্র পত্র পত্রিকার এক দর্পণ। আজ এ পর্যন্ত--নিবেদন ইতি: তাপসকিরণ রায়, সম্পাদক, বর্ণালোক।

সহঃসম্পাককের কলমে:

মানুষের মানসিক অবস্থার যখন অবনতি হয় তখন বোধহয় কোন কিছুই ভালো লাগে না। কিন্তু আমার এই প্রিয় পত্রিকার ডাক এলে, বিশেষ করে আমার প্রিয় দাদার ডাক অমান্য করতে পারি না। কিছু না কিছু মনে হয় লিখেদি, দাদার তো বলেছে। হয় তো এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পাবো। আপনারা দিনের পর দিন এতো লেখা দিচ্ছেন ভালো লাগছে। পত্রিকাকে আরও ভালোবাসুন।
--সমিত কর্মকার, সহ-সম্পাদক, বর্ণালোক।

সহ সম্পাদকের কলমে--

ভালো লাগার বিষয় বলে আনন্দের জন্য দুচারটে লেখালেখির চেষ্টা করি বৈ তো নয়! তাই কোন বিষয়ে বেশ গুছিয়ে বাগিয়ে কিছু বলা কিংবা লেখার মতো বিদ্যে বা বুদ্ধি কোনটাই আমার নেই। যদিও আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে যতটুকু বুঝেছি সেটুকু সম্বল করেই অণুগল্প নিয়ে আজ নাহয় দু চারটে কথা বলা যাক । প্রথমতঃ কথাটা হলো অণুগল্প,অনুগল্প নয়।

ক্ষুদ্র আকারের গল্প,যদিও গল্পের স্বাদ থাকবে পুরো মাত্রায়। অণুগল্প সম্পর্কিত নানা নিয়মের কথা শুনেছি। অন্যরাও জানেন, বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র! সে চেষ্টাও করছি না। শুধুমাত্র দুচারটে কথা অণুগল্প সম্পর্কে বলতে ইচ্ছে হলো বলেই বলছি। একটি নিটোল গল্পের আস্বাদন পেতে হবে অথচ সেটি আকারে গল্পের চেয়ে আকৃতিতে অনেকটাই ক্ষুদ্র।

বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু দর্শন করানোর চেষ্টাটাই লেখকের আসল লক্ষ্য। পাঠক তো আর অণুগল্পের ব্যাকরণ জানতে চান না, চান সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে। ঠিক যেন ঘাসের ডগায় এক ফোঁটা শিশির, আলোয় ঝলমল করছে।
হঠাৎ করেই শুরু হয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া অণুগল্পের আরেকটি ধরণ। মনে হতেই পারে যেন ঝপাং করে লাফ দিয়ে চলে এলো বিষয়ে।
ঘটনার ঘনঘটা নাই,নাই অহেতুক বিন্যাসের আয়োজন। অপ্রয়োজনীয় অলংকার বর্জিত ছিমছাম এক একটি ব্যক্তিত্বের মতো যেন অণুগল্পগুলি।--সাবিত্রী দাস, সহ সম্পাদক, বর্ণালোক।

নীলার ভালোবাসা






নীলার ভালোবাসা

সন্ধ্যা রায়




ডাক্তার চেক আপে আসছেন, বলে গেল নার্স। ডাক্তার নীলাক্ষী মিত্র আসছেন।

--কেমন আছো প্রতীক ?

প্রতীকের দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

--কি হল কাঁদছো কেন ? কি ভালো নেই ? কিছু অসুবিধা আছে ? প্রতীক নীলাক্ষীর কোভিড পেশেন্ট। রোজ প্রতীককে দেখতে আসে, এখন তো অনেকটা ভালো আছো প্রতীক, তবে কেন কাঁদছো বল আমায় ? কি অসুবিধা ? কাঁদলে তো আমি বুঝতে পারব না, বল প্রতীক ! তুমি এখন অনেকটা ভালো আছো।

নীলাক্ষী দেখল, প্রতীকের শারিরীক কোন অসুবিধা নেই। একটু দুর্বল, ওকে দুদিন পরে ছেড়ে দেবে।

বারবার জিজ্ঞাসা করার পরেও প্রতীক কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে কাঁদতেই থাকলো। নীলাক্ষী বেরিয়ে এল। ডাক্তার নীলাক্ষী নার্স মাধুরীকে বলল, এখন প্রতীক ঠিক আছে। কথা কটি বলে নীলাক্ষী বেরিয়ে গেল। নার্স ডাক্তারের সাথে সাথে যেতে যেতে বলল, ম্যাডাম শুনেছি প্রতীকের বাবা-মা দুজনেই কবিডে মারা গেছে।

নীলাক্ষী বলল, এবার তো অনেকেই নিজের আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়েছে। দুদিন পর প্রতীক ছুটি পেয়ে যাবে।

নীলাক্ষী বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ প্রতীককে রাস্তায় দেখতে পেল। প্রতীক রাস্তার পাশে গাছের নিচে একটা পাথরের উপর বসে আছে। নীলাক্ষী গাড়ি থামিয়ে প্রতীকের কাছে গেল। প্রতীককে জিজ্ঞাসা করে, তুমি এখানে কেন বসে আছো প্রতীক ?

প্রতীক চুপ করে বসে থাকল, কোন কথার জবাব দিল না। যেন সে একটা প্রস্তর মূর্তি। নীলার মনে পড়ল ওর বাবা-মা দুজনেই মারা গেছে, নার্স বলেছিল। নীলা একটু ঝুঁকে প্রতীকের কাঁধে হাত রেখে বলল, উঠে এসো প্রতীক, আমার সাথে যাবে চলো।

নীলা প্রতীককে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো। বাড়িতে বুড়িমা প্রতীককে দেখে বলল, তোমার নাম কি বাছা ? নীলাকে বলল, আবার কাকে নিয়ে এলি তুই ?

নীলা বললো, মা ছেলেটিকে স্নান করতে দাও, বিধু দাদাকে বলো, ওর কোভিড হয়েছিল, ওকে ভালো করে স্নান করাতে বলো। ওকে খেতে দিতে বলো। তুমি যাবে না ওখানে, অবশ্য প্রায় এক মাস হয়ে গেছে, এখন ও ঠিক আছে, বলে, নীলা নিজের ঘরে ফ্রেশ হতে চলে গেল। নীলা দেখল বিধু দাদার পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে প্রতীককে খুব সুন্দর লাগছে।

নীলা দেখল, প্রতীক নিজের মা-বাবার বিয়োগব্যথা এখানে থেকে বেশ সামলে উঠেছে। নীলা প্রতীকের খুব খেয়াল রাখে। প্রতীকের প্রতি কিছুটা সহজ হয়ে উঠেছে। প্রতিক এক সকালে বলল, আমি এখন ভালো আছি, নীলা, ভাবছি নিজের ঘরে চলে যাব, আমি তোমার নাম ধরে বলে ফেলেছি, কিছু মনে করো না--

নীলা বললো, আমি খুব খুশি হয়েছি, প্রতীক নিজের বাড়ি গেল।

বাড়িটা কেমন খা খা করছে, প্রতীকের একেবারেই ভালো লাগছে না। মাসিমা, বিধু দাদা, নীলা সবাই আছে ওখানে। আমার আর এখানে ভালো লাগে না।

সকাল হতেই প্রতীককে দেখতে পেয়ে নীলাক্ষী বলল, এখানেই থাকো না কেনো ? মা বললো তোমার জন্য মারও চিন্তা হয়, খাওয়া-দাওয়া করলে কিনা--

বিধু দাদা বলল, তুমি থেকে যাও দাদাবাবু !

প্রতীক থেকে গেল। ওখানেই নীলার সাথে বাজারে যাওয়া ঘুরতে যাওয়া পুজো দেখা এমনি করে প্রতীক বেশ সহজ হল। ওরা বুঝতে পারল না ওদের কখন যেন প্রেম হয়ে গেছে। প্রতীক নীলার প্রেমের আভাস পায়। প্রতীক নিজের চাকরি খুঁজতে বের হয়--সকালে বের হয়, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। এমনি রোজ রোজ চলতে থাকে, নীলা কতদিন ধরে লক্ষ্য করছে প্রতীক খুব রোগা হয়ে যাচ্ছে। নীলা বললো, প্রতীক তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কোন শরীর খারাপ হয়নি তো ?

--কি বলছ নীলা, আমি তো দিব্যি আছি--

নীলা বললো, না, তুমি দিব্যি নেই, নিজের দিকে খেয়াল রাখো। পরদিন নীলা রাতে প্রতীকের ঘরে এলো। প্রতীকের গায়ে হাত রেখে বলল, প্রতীক তোমার গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে--

--ও কিছু না--আজ রোদে ঘুরে ছিলাম তাই--

নীলা বলে, না না, বেশ জ্বর তোমার--দাড়াও আসছি, বলে, নীলা ছুটে বেরিয়ে গেল। এক গ্লাস জল ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। জলপট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানোর পরেও জ্বর নামল না। দুদিন পরে হসপিটালেএডমিট করতে হল প্রতীককে। হাসপাতালে দেখাশোনার ভার নীলাই নিল।

কদিন হয়ে গেছে প্রতীকের জ্বর নাচছে না। নীলা চিন্তায় পড়লো। সিনিয়র ডাক্তার এলো। সব রকম পরীক্ষা হল, নীলা চিন্তায় পড়েছে। নীলার হাত ধরে থাকে প্রতীক। জ্বরের ঘোরে খালি মা মা বলে। পরদিন রিপোর্ট এলো। প্রতীকের ক্যান্সার হয়েছে। নীলা যা ভেবেছে, তাই, প্রতিক অপারেশনের সময় দিল না--রাতে ধুম জ্বর--প্রতীক চুপ করে শুয়ে থাকলো। সকালে সে সুদূর আকাশ পাড়ি দিলো।

এত রোগীকে মরতে দেখেছে নীলা--এমনি মন খারাপ হয়নি তার। এবার নীলা রুদ্ধশ্বাসে কেঁদে উঠলো, হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। সে যে প্রতীকের খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিল।



সমাপ্ত

হঠাৎ ভালোবাসার ছোঁয়া

 

 







হঠাৎ ভালোবাসার ছোঁয়া

শমিত কর্মকার

সুন্দর একটা মুখ এবং সেই মুখে মিষ্টি হাসি দেখতে কে না ভালোবাসে!সাহেব বাগানের ঐ বাড়িটার দিকে সবার নজর। রোজ যাওয়া আসার পথে রুপমের ঐ বাড়িটার দিকে চোখ চলে যায়। আর বাড়ির দোতলায় দাঁড়িয়ে থাকে ঐ সেই মেয়েটি।

রুপম ছেলে হিসেবে খুব খারাপ নয়। সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে পাশ করেছে। একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ানোর চাকরি পেয়েছে মাস খানেক আগে। কলেজে যাওয়ার সময় ঐ সাহেব বাগানের মোড় দিয়েই যেতে হয়।

এমন একদিন রুপম ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে আর ঐ মেয়েটির দিকে চোখ যেতেই সে সাথে সাথে নিচে নেমে আসে। আর তার ডাক ও ভাই শুনুন। রুপম থতমত খেয়ে গেল প্রথমটা, তারপর বলল বলুন। আপনি এই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রোজ আমার দিকে তাকান কেন? আমতা আমতা করে বলল ভালো লাগে তাই। ---তাই বলে তাকাতে হবে? ---হ্যাঁ আপনি সুন্দর তাই! মেয়েটি রেগে গেলেও হঠাৎ যেন হেসে ফেলল।--ও তাই বুঝি?-- রুপমের উত্তর হ্যাঁ। মেয়েটি আর ঠিক থাকতে পারলো না হাসতে হাসতে রুপমের সামনে হাত বাড়িয়ে দিল! আপনার সাহস আছে, আবার দেখা হবে।



********

Tuesday, 6 July 2021

কামনা




কামনা

সান্ত্বনা চ্যাটার্জী



আয়নায় নিজেকে আর এক বার দেখে নেয় আরতি । কি নেই তার মধ্যে যে কিছুতেই সে অজিতের মনের মানুষ উঠতে পারছেনা । বিয়ের পর দিন থেকেই সে তার প্রাণ মন দিয়ে অজিত কে ভালবাসতে চেষ্টা করেছে, হয়ত পেরেছে ও কিছুটা কিন্তু অজিত, কেন অজিত এমন ছাড়া ছাড়া থাকে ! তার কি অন্য কোনও প্রেয়সী আছে, বা অন্য কোনও মেয়ে মানুষ, নয়ত এমন ব্যবহার কেন?

বাবা মায়ের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করেছে অজিত ;বাধ্য হয়ে ভুলে যেতে হয়েছে তার প্রথম প্রেম মানসীকে, তার মনের মানুষ মানসী । মানসীর জন্য পৃথিবীর সবার সঙ্গে লড়তে পারত অজিত, কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে কি করে যুদ্ধ করবে। মাত্র তিন দিনের অজানা জ্বরে মারা গেছিল মানসী আজ থেকে তিন বছর আগে। পৃথিবী থেকে মুছে গেলেও, অজিতের মন থেকে কেউ সরাতে পারবেনা তার মানসী কে , কেউ না আর তাই নিজের বৌয়ের বিরুদ্ধে এক অযৌক্তিক বিদ্বেষে তার মন ভরে থাকে।।

অজিত কাগজের থেকে চোখ না তুলেই ডাকে- মায়াদি, এক কাপ  চা দাও না।

দূর থেকে সারা আসে এই দিচ্ছি দাদাবাবু ।


উঃ অসহ্য , মনে মনে ভাবে অজিত । সারি, গয়না, সাজ গোজ, আর টেলিভিশনের প্যান প্যানে ধারাবাহিক, এর বাইরে কোনও জগত নেই তার বৌ এর। এই যে দেশে এত বড় ঘটনা ঘটল, বিজেপি এত বছরের দল জাতীয় কংগ্রেস কে গো হারান হারাল, কোনও অভিব্যক্তি আছে তার জন্য। শুধু মাত্র একটা সুন্দর শরীর ।


বৌ কে নিয়ে ‘শব্দ’ দেখতে গেছিল অজিত, মাঝ খানেই আরতি বলে ওঠে, এ কি সব দেখাচ্ছে বলত, শুধু নানা রকম শব্দ । সেদিন থেকে অজিত প্রতিজ্ঞা করেছে আরতি কে নিয়ে আর সিনেমা দেখতে যাবেনা, যেতে হলে নিজে একা যাক পাগলু, খোকা চারশো বিশ। নিজের চেনা জগতের বাইরে ও যে কোনও জগত থাকতে পারে, ভাবনার চিন্তার নিজের ভিতরের মানুষটাকে জানার, এ সব আরতির জগতে নেই । দেহ সর্বস্ব মেয়ে মানুষ। মোটা পাছা আর ভারি বুক আর একটা সুন্দর মুখ নারী কে আকর্ষণীয় করে তোলেনা এটা  বোঝেনা কেন কে জানে। 

চা শেষ করে চটিতে পা গলায় অজিত । কোথায় যাচ্ছ ?

হাঁটতে, কেন ?

একটা ওডিকলোনের শিশি এনো না গো বাবুর দোকান থেকে ।

ঠিক আছে ।

বেশ রাত করে ফেরে অজিত , তার খাবার সাজিয়ে বসে আছে আরতি।

খাওয়া শেষ করে কিছু ক্ষণ খবর শোনে অজিত তার পরে শুতে যায়।

রোজকার মতন আজও খবর চালিয়ে বসল টিভির সামনে । এ সময়

আরতি , রাতের প্রসাধন সারে, চুল বাঁধে, গায়ে গন্ধ মাখে । তার পর বিছানায় অপেক্ষা করে । অজিত খবর শুনে, হাত পা ধুয়ে শোবার ঘরে ঢোকে। আজ ঘরে একটা চাপা ওডিকলোনের গন্ধ, সদ্য কিনে এনেছে অজিত দোকান থেকে ।

ঘরের আলো নেভানোই ছিল । পাজামার দড়ি আলগা করে খাটে ওঠে অজিত,

পাশে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় উদগ্রীব আরতি । সেই নরম গরম লোভনীয় শরীরের আহ্বান অবজ্ঞা করার শক্তি তার নেই। চাপা গালাগাল দিয়ে শরীর নিয়ে খেলা শুরু করে। ক্রমশ ঘৃণার নারী তে প্রবেশ করে সে আর তার প্রতি রোম রোম কামনা আর সুখে কাঁপতে থাকে ।ক্রমশ আরতির শীৎকার ও চাপা গোঙ্গানি আর অজিতের শরীরের ওঠানামা শেষ সীমায় এসে থেমে যায়।

অজিত উঠে একটা সিগারেট ধরায়, ঘৃণা ঘৃণা আর ঘৃণা করে সে নিজেকে আর আরতি কে।

এ ই কাম তাকে প্রতি রাতে হারিয়ে দেয় ঘৃণার মেয়ে মানুষটার কাছে ।

 

আজ থেকে কথা বলবো


 


আজ থেকে কথা বলবো
বহ্নি শিখা

সৌম্যর স্কুল বন্ধু জমজ বহ্নি আর জাহ্নবী,জাহ্নবী তার দাদার বউ হয়ে এবাড়িতে এসেছে। একই ক্লাসে পড়তো বলে নাম ধরে ডাকার অভ্যেস যায়নি।
সৌম্য বলছে,জাহ্নবী একটা বিষয় লক্ষ্য করছি, তুমি বুঝতে পারছো কি? আমি কি বলতে চাইছি?
---হুম,
কি? বলো।
--- কিছু একটা তো বটেই। তবে আমি বলবো না। তুমি বলো,কি জানতে চাও।
--ব্রহ্ম' তোমার সাথে কথা বলে না?
- না।
তুমিও বলো না?
---আমাকে তো বলতেই হবে।
এ পরিস্থিতি কেনো? কি হয়েছিলো?
---সব কথা সহজভাবে নিতে পারিনি তাই।
কি কথা জানতে পারি?
--- লুকোনোর কিছু নেই। তবে পুরোনো কাসুন্দি ঘাটতে চাই না।
কিন্তু তোমার বলতে অসুবিধা কোথায়? আমি তো আর কাউকে বলে কয়ে বেড়াচ্ছি না।
---ব্রহ্ম আর তোমাতে কোন তফাৎ দেখি না। অন্তত আমার কাছে নেই।
তুমি কি ব্রহ্ম'র সাথে আমাকে তুলনা করছো?
---বাধ্য হয়েই। করছি।
কারণ জানতে পারি?
--- নিজেকে জিজ্ঞেস করো।
হুম, তা না হয় করলাম। কিন্তু ইংগিত দাও কিছু একটা।
--- আধাযুগ পরে এতো কিছু জানতে চাইছো কেনো? এর আগে কোন খোঁজ নাওনি তো?
এ বিষয়ে পরে কথা বলবো। ব্রহ্ম কোথায়?
--- ওর ঘরে।
কি করছে?
--- জানিনা, হয়তো লিখছে।
সাহিত্য চর্চা করে না কি?
--- হয়তো করে।
তুমি জানো না?
--- করে বলেই আগে জানতাম। এখন জানিনা।
তুমি কি ফেসবুক ফ্রেন্ড নও?
---হ্যাঁ,তবে একটা।
ফেইক আইডি আছে না কি?
---আজকাল সবারই ফেইক আইডি থাকে তা তো জানোই। কারোর একটা,কারোর একের অধিক।
ঠিক আছে। আমি একটু বেরোব।
ওকেও নিয়ে যাবো।
নির্মল সৌম্য ব্রহ্ম এদের তিন ভাইয়ের মধ্যে নির্মল সবার বড়। নির্মল এস এস সি পাশ করার পর অজ্ঞাত কারনে নিখোঁজ ওদের বাবা বিমল সেন। উপজেলা শহরের বড় ওষুধের দোকানের মালিক।
অনেক খোঁজাখুজি করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। ওদের মা মারা গেছে ক্যান্সারে। দোকানটিই ছিলো ভরসা। শেষমেশ সেটিও মা'য়ের চিকিৎসায় শেষ। বাড়িভিটা বলতে দুটো ঘরই সম্বল।
নির্মলকে সবাই নিমু ব'লে চেনে। অনেক বলে কয়ে নিমু একটা স্কুলে চাকরির বন্দোবস্ত করেছিলো স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান কে ধরে। সেই থেকে নিমু ছোট ভাই দুটো কে বুকে আগলে রেখেছে। বুঝতে দেয়নি বাবার অনুপস্থিতি। নিজে পড়তে পারেনি। ভাইদের পড়াশোনায় যাতে ক্ষতি না হয় সবসময় সে চেষ্টাই করে গেছে।
সৌম্য দাদার মান রেখেছে। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা শেষ করেছে। সে জন্য নিমুকে অবশ্য বাড়িটা বন্ধক দিতে হয়েছে।
দু'রুমের ভাড়া বাসা নিয়ে থাকে নিমু আর ব্রহ্ম।
জানতো না তাদের বাড়িটি বন্ধক দিয়েছে দাদা। আজই জানলো ব্রহ্ম'র কাছে।
ব্রহ্ম বাড়িটা ছেড়ে যেতে চাইছিল না,এখানে বাবা মা'র স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু নিরুপায নিমু। ব্রহ্মকে বলেছিল টাকা হলে আমরা আবার বাড়িটা ফিরিয়ে আনব।
ব্রহ্মকে সাথে নিয়ে বাড়িটা দেখে এলো সৌম্য। হুহু করে কেঁদে ওঠেছিল বুকের ভিতর। মা-
বাবার স্মৃতি প্রতিটি বালিকণায়৷
আম,জাম,কাঁঠাল পেয়ারা, নারকেল সুপুরি আতা গাছগুলো সব আগের মতোই আছে।
ওদের দেখে যেন নড়ে ওঠে প্রতিটি গাছ। স্পর্শ পেয়ে তৃপ্তি পায় উভয়েই।
অকৃত্রিম ভালোলাগা জড়িয়ে স্নেহ ভালোবাসার বন্ধনে দোলে ওঠতে লাগলো ওরা প্রকৃতির মায়ায়।
এই বাড়িটা ঠিক রেখে,এর পাশের জায়গাতে বহুতল বিল্ডিং তুলবো যাতে ভাড়া খাঁটিয়ে থাকা যায়।
কি বলিস ব্রহ্ম?
--- তাহলে তো খুবই ভালো।
ঠিক করেছি আজই দাদাকে বলবো ছাড়িয়ে নিতে।
ব্রহ্ম উৎফুল্ল স্বরে বলল, বৌদি তোমাকে কিছু বলেছে?
--- কই? না তো? কিছু বলার ছিলো কি?
--- না--,
জাহ্নবীর সাথে কথা বলতে দেখিনি তোকে,কিছু হয়েছে না কি? কিছু বলেছে?
--- না,আমি বলিনি এতোদিন।
আজ থেকে বলবো। তুমি বাড়িটি ফিরিয়ে দেবে তাই।
সমাপ্ত


কোভিড--19

 



কোভিড--19

বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল




আমাদের দুইটি পাখি ছিল, একটা টিয়া আর একটা মযনা। ওরা আলাদা আলাদা খাঁচায় থাকত। টিয়াটার নাম মিঠু আর ময়নাটার নাম সুন্দরী।

মিঠু উড়ে এসে পড়েছিল আমাদের ছাতে। মে মাসের ৩১ তারিখ ২০১০ সালের কথা, সে দিনই আমি সিংগাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ঘুরে বিকালে ঘরে পৌছে ছিলাম। ওখানে আমি চিড়িয়াখানায় অনেক পশু পাখি, জীবজন্তু ময়না টিয়া দেখেছিলাম। আমি বললাম, আরে টিয়াটা কি থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে জংগল চিড়িয়াখানা থেকে আমার সাথে উড়ে এল !

যাইহোক সে দিন থেকে মিঠু আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেল। বোধহয় ও কারো পোষা ছিল কারণ ওর দুই পাশের ডানাগুলি বেশ যত্ন করে ছোট করে ছাঁটা। নতুন অতিথি হিসেবে মিঠুকে নিয়ে পরিবারে একটা উৎসাহের আলোড়ন চলতে থাকে। আমার ছোট ভাই পেযারা আপেল কলা টুকরো টুকরো করে কেটে বেশ একটা ডেজার্ট তৈরি করে ছোট একটা বাটিতে ওর খাঁচায় রেখে দিত।

আমার ছোট নাতনি জলি বেশ কিছু পাকা লাল লংকা খাঁচার ভিতর রেখে দিযে মিঠুর দিকে তাকিয়ে থাকত। মিঠু এত সব খাবারের আয়োজন দেখে ও আমাদের দিকে তাকাত আর ফল কাঁচা পাকা লাল লংকার দিকে তাকিয়ে খাঁচার ভিতর এধার ওধার পায়চারি করত। খেত না। আমারা সবাই সামনে থেকে চলে গেলে ও খেত। বুঝতে পারতাম খেয়েছে।

প্রায় ছয় মাস পরে এক দিন সকালে আমার ছোট ভাই ময়নাটাকে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো, বলল, দাদা পাখিটাকে জংগল থেকে একটা লোক ধরেছিল আমাকে পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করেছে। ময়নাটার ছোট গলার চারিদিকে একটা সোনালী রেখা মালার মতো গলায় যেন পরে রয়েছে। দিদি পাখিটাকে দেখে বললো, আরে সুন্দরী ময়নাটা তো ! আর সেই থেকেই ময়নাটার নাম সুন্দরী হয়ে গেল।

নভেম্বরের শেষের দিকে আমার ভাই বলল, দাদা বুলবুল আসছে।

আমি বললাম, কি ব্যাপার আর একটা পাখি পেলি নাকি ?

--না দাদা, এ বুলবুল ভয়ঙ্কর এক সামুদ্রিক পাখি, একে মানুষের সাধ্য নাই পোষ মানায়। এ আসছে পৃথিবীর যত অন্যায় অবিচারের প্রতিশোধ নিতে। বন্ধন ও পরাধীন করা সব জীবকে মুক্ত করতে। ভযংকর তার গতি, পরাধীনরা মুক্তি পাবে, বন্ধনের বন্ধন খুলে প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেবে।

আমি ভয়ভীত হয়ে বললাম, কি এই বুলবুল পাখি, তার এতো আক্রোশ কেন ?

সে দিন সন্ধ্যা হতে হাওয়ার তেজ বেড়ে গেল, ভীষণ ভাবে চারিদিকে বজ্রপাত তারপর অঝোরে বৃষ্টি। যেন মহাপ্রলয়। সমুদ্র ফুলে ফেঁপে অজগরের গর্জন করতে লাগল। আমারা দরজা জানালা বন্ধ করে প্রবল উৎকন্ঠায় রাত কাটালাম।

সকালে বর্ষা থামলেও হাওয়ার গতি বেশ জোরালো।

এই ভাবেই বেশ চলছিল। প্রায় দশ বছর মিঠু আর সুন্দরী পাশাপাশি খাঁচায় বাস করত। মানুষের মতই ওদের স্নান খাওয়া চলতে লাগল। ওরা অজন্তে পরিবারের এমন সদস্য হয়ে গেল যে বিগত দশ বছরে পরিবারের হাসি কান্না সুখ দুঃখের সাথী হয়ে রইলো।

মিঠু আর সুন্দরী ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেছে। ভাবছে বুলবুল কি তাদের সাথী পাখি না প্রকৃতির কোন অভিশপ্ত পরি যার ডানার ঝাপটায় যত অন্যায় অবিচার ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।

বদ্ধ জীবজন্তুদের বন্ধন খুলে মুক্তি দিতে এসেছে। যেন বলছে ওরে মিঠু সুন্দরী তোরা মানুষের ছদ্ম মায়ায় না ভুলে খাঁচা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আয়।

বুলবুল তার আক্রোশ মিটিয়ে চলে গেল--অনেক ক্ষয়ক্ষতি ভাংচুর প্রাণ বিয়োগও হয়ে গেল। আমার ভাই বলল, দাদা এ ঘরটায় আর থাকা যাবে না। চলো আমাদের যে ফ্ল্যাটটা আছে ভাড়াটে উঠিয়ে সেখানে গিয়ে থাকি তারপর ঘরটা রিপেয়ার করে আবার এখানে এসে থাকব। তিন মাসের মধ্যে আমরা ফ্ল্যাটে আদ্ধেক জিনিসপত্র নিয়ে উঠলাম। মিঠু আর সুন্দরী এ ঘরে থাকতো সিঁড়ি ঘরে পাশাপাশি খাঁচার ভিতর। ফ্ল্যাটে ওদের জায়গা হলো ডাইনিং হলের জানালার নীচে। ডাইনিং টেবিলটার অনেকটা পাশেই। আমি যখনই ব্রেকফাস্টে বসতাম মিঠু অমনি চেঁচাত, মিঠু খাবে মিঠু খাবে বলে। আমি খাওয়া থেকে উঠে ওদের ফল অন্য খাবার মিঠু আর সুন্দরীকে দিতাম।

২০১৯-এর মার্চ মাসে মানুষ হঠাৎ আক্রান্ত হল কি এক অজানা রোগে। সবারই মুখে মাস্ক বারবার হাত ধোয়া যত সাফ সাফাই থাকার ব্যবস্থা। কোন পশুপাখি আক্রান্ত হল না। দীপ জ্বালানো থালা বাজানো শংখ ধ্বনি কত কি চলল। আক্রান্তের প্রথম ভাগ দ্বিতীয় ভাগের শেষের দিকে এখন delta + , কি দুর্দান্ত প্রকৃতির পরিমাপ। কত প্রিয়জন কত আপনার কাছের লোক দুরে বহু দুরে চলে গেল। কত আকুতি কত কান্না--প্রকৃতি অশান্ত। তার সংশোধনের কাজ চলতে লাগল। সবাই আমরা এক নীরব দর্শক হয়ে দেখছি। বৈজ্ঞানিক প্রাকৃতিক চিকিৎসা সবই চলছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি শুধুই অপেক্ষা করছি প্রকৃতির হিসাব কবে মিলবে।



এই দুই মাস আগে যথারীতি ব্রেকফাস্টের সময় আপেল ভেংগে দুটুকরো করে মিঠু আর সুন্দরীকে দিতে গেলাম। কিন্তু এ কি খাঁচা কোথায় মিঠু আর সুন্দরী কোথায় ? জায়গা ফাঁকা। তখনই আমার নাতনি জলি এসে বলল, দাদু মিঠু আর সুন্দরীকে বাবা নন্দন কাননে অন্য পাখিদের সাথে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ফলের টুকরো হাথে আমি কিছু সময় অপলক তাকিয়ে থাকলাম। আমার হঠাৎ মনে হল, তা হলে কি আমরা অসংখ্য মিঠু আর সুন্দরীদের প্রকৃতির পরিবেশে না রেখে ওদের আমাদের ইচ্ছে বা শখ পুরনের জন্য প্রকৃতির বিরূপের ও আক্রোশের শিকার হয়েছি ? মনে মনে বললাম, ভালোই হয়েছে মিঠু আর সুন্দরী তোমারা প্রকৃতির নির্মল পরিবেশে গাছগাছালির ভিতর তোমাদের সুরে আবার গান গাও। পৃথিবী শান্ত হোক, সুস্থ হোক।

কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে




কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে / কৌস্তুভ দে সরকার


সকালে উদগ্রীব এসে ঘুমের থেকে জাগিয়ে তুললো তপস্তুভ কে। "কিরে, উঠিস নি এখনো? যাবিনা রুদ্রান্তদের ওখানে?" কম্বল সরিয়ে উঠে বসে বিস্ময়ের মুখে তপস্তুভ বলে,"কেন, কি আছে আজ ওখানে?"

"ওমা, সেকি, তুই জানিস না? আজ না কবি শ্যামলতনু তন্তুবায়ের আসার কথা!" 

"কে শ্যামলতনু?"

"সত্যি মাইরি! তুই না কোনো খোঁজখবরই রাখিস না!" 

"আরে অত ভনিতা না করে বলনা।"

"আরে গান্ডু, শ্যমলতনু হচ্ছে এখন সেই লোক যার হাতে প্রচুর ক্ষমতা ! রাজ্যের কবিদের অন্যতম আরাধ্য এখন উনি।" 

"সেটা কিরকম?"

"আরে গাধা, আমরা যারা এদিক থেকে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা পাঠাই, সেগুলির প্রকাশের দায়িত্বে তো এখন উনিই থাকেন! উনার হাত থেকে বেরোলে তবেই সেটা ছাপা হবে। আর একবার কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা বের হলে তো বুঝতেই পারছিস!"

"ও, তাই নাকি? তা হঠাৎ রুদ্রান্তদের ওখানে উনি আসছেন কেন?"

"আরে, রুদ্রান্তর বেশ কয়েকটা কবিতা বেরিয়েছে না কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে ! ওর সাথে তো উনার খুব ভালো সম্পর্ক এখন। তা উনি দার্জিলিং গেছিলেন, তাই ফেরার পথে এখানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তাই তার সৌজন্যে রুদ্রান্তদের ওখানে আজ একটা সাহিত্য আসর। সবাই যাচ্ছে। চল, যদি যোগাযোগ করে কিছু একটা করতে পারা যায়!"

তপস্তুভ নিজেও কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠিয়েছে, কিন্তু ছাপেনি। ও জানে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে একবার কবিতা ছাপা হলেই এদিককার কবিরা জাতে উঠে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে মানে কি, প্রকৃতপক্ষে সবাইই। একমাত্র তপস্তুভ ওসব ভাবেনা। তবে এদেরকে দেখানোর জন্য ও নিজেই বাইপোস্টে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে চার পাঁচটি কবিতা পাঠিয়েছিল। ছাপেনি। ভেতরের গল্প যে এতকিছু, তা তো অতটা সে জানেনা। তপস্তুভ এখানে যারা যত লেখে তাদের সবার চাইতে ও বেশ অন্যরকম। বাংলা কবিতার বিবর্তনের ধারা বুঝে ও আগামীর কবিতাই এখন লিখছে। ওর খিদেটা অন্যরকম। যাইহোক, ভদ্রলোককে দেখে আসার জন্য না হয় সে যাবে। যথারীতি দুপুরে খেয়েদেয়ে, জিন্সের প্যান্টের উপর একটা গেঞ্জি গায়ে সাইকেল নিয়ে তপস্তুভ বেরিয়ে পড়ে। লেখার ডায়েরি নিল না। মোবাইলেই দু চারটে লেখা আছে, আর স্বরচিত অনেক কবিতা ওর স্মৃতিতেই থাকে। প্রয়োজন হলে পড়বে, না হলে পড়বে না। ও তো যাচ্ছে এখানকার কবিকূলের হ্যাংলামোপনা দেখতে আর ব্যাপারটা কি সেটা এনজয় করতে। 

রুদ্রান্তদের ওখানে আজ সিঁড়িতেই যত চটি জুতো দেখা যাচ্ছে, হলঘর যে ভিড়ে ঠাসা ও বেশ বুঝতে পারে। বসল গিয়ে শেষের এক বেঞ্চিতে। ততক্ষণে ব্যক্তিপূজোর সমাপ্তি ঘটে গেছে। লোকাল কবিদের পড়াও প্রায় শেষ। তপস্তুভকে পেছনে বসতে দেখে একজন বলেই উঠলো, আরে ওই তো তপস্তুভদা এসে গেছে, ওর কবিতা শুনি এবার। তপস্তুভ বড় অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে জানায় তার আজ শরীরটা ভালো নেই। সে শুধু দেখতে এসেছে, কবিতা সঙ্গে আনেনি। শ্যমলতনু বাবুর কথা ও কবিতা শোনাতেই ওর আগ্রহ বেশি। অগত্যা শ্যামলতনু তন্তুবায়ের সমাপ্তি ভাষণ ও কবিতা পাঠ। শ্যামলতনু বাবু এখানকার কবিদের লেখালেখির জন্য আরো উৎসাহ দিয়ে বেশ কিছু সুপরামর্শ দিয়ে কবিতা পাঠ শুরু করলেন। তপস্তুভ অবাক হয়ে শুনতে থাকে। শ্যামলতনু বাবুর প্রতিটি কবিতাই ওর খুব চেনা চেনা লাগে। মনে হয়, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইতো, এর পরের শব্দটা এরকমই হবে। এই তো এরকমই সে কয়েকটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিল কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে। কবিতা পড়ার পর সমবেতদের সেল্ফি তোলার উৎসাহের ভিড়ে হারিয়ে যান শ্যামলতনু বাবু। তপস্তুভ ততক্ষণে সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথে, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় সে, আর কোনো দিন কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বা কোথাও আগাম কবিতা পাঠাবে না। তেমনভাবে কেউ না চাইলে কোথাও ওর লেখা আর দেবে না। শুধু নিরলসভাবে ও লিখে যাবে।


Monday, 5 July 2021

ঘাম


 



ঘাম

____


জয়িতা ভট্টাচার্য 


রতনে রতন চেনে কথাটা ভয়ানক ভাবে সত্য।অন্তত পটাশপুর ৪নং গ্রাম পঞ্চায়েত এর শিখণ্ডিপাড়ায় ত বটেই।

এ হেন নামই বা এলাকাটির কে রেখেছিলো আজ আর জানার উপায় নেই তবে কার্যকারণে যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়।

রতন সেন শক্তিশালী নেতা তার অট্টালিকার বারান্দায় বসে দার্জিলিং চায়ের সঙ্গে ফুলকো লুচিসহ আলুরদম খেতে খেতে একথাই ভাবছিল।এমনিতে গ্রামটা বেশ সুন্দর।ছোটো ছোটো বাড়ি,মাটির বা টালির একটা দুটো একতলা পাকা ঘর,মাটির রাস্তা এবড়োখেবড়ো, কাঁচা নয়ানজুলি আর বট অশত্থ সজনে আরো কত গাছ।একটা গ্রাম ত এমনই হবার কথা।

পয়সা নষ্ট সে হতে দেয়নি।পাকা সড়ক,ড্রেন,ইত্যাদি গ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করে।বাড়িটা তাই আড়ে বহরে বেড়েছে।বছর বছর রং।ঝকঝকে।শুধু......শধু ওই পথের বাঁকে রতন কামারের দোকানটা.....।সব সময় ভিড়।আড্ডা।আলোচনা।শুনেছে রতন হরেক রকম আরো কাজ করে।

এ গ্রামে তাই রতন বলতে কামার কে বোঝে প্রথমত লোকে তারপর রতনবাবুর খোঁজ মানে রতন সেন।ব্যাপারটা যারপরনাই বিশ্রী।

 হাঘরের বেটা।ছোটোলোক যেমন হয়।করিস ত কামারের কাজ।বামন হয়ে চাঁদে হাত..........

___"দাদা নীচে লোক অপেক্ষা করছে।আজ আপনার কান্তাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির বৈঠক"

__" তারপর?"

__"দাদা ওটা যেতে আসতে তিনটে হয়ে যাবে।বিকেলে মাঠে যেমন বসেন.....দু চারটে কেস আছে ওগুলো...."



 __"ওঠো দেরি হয়ে। যাবে চা আর বাসি রুটি দুখান খেও।"

বউ বাবুর বাড়ি কাজে চলে যায়।

রতন জেগেছে অনেক্ষণ।ভাবছে।অনেক কিছু ভাবছে।কূলকিনারা নেই তার।বাইরের কুয়াশা মনে ছেয়ে আছে ।পুকুর থেকে স্নান করে সব সেরে দোকান খোলে।তার দোকান সবার আগে খোলে।

তারপর হাঁপরে পিটতেই থাকে।আগুনটা জ্বলে ধিকি ধিকি।হাতুড়ির ঘা।কাস্তে কুড়ুল দা পড়ে আছে। সকালের খদ্দেরের চেয়ে রাতের খদ্দের বেশি ইদানিং।

          মাঠের পাড়ে সালিশি সভা।ভিড় যেন পাতলা? লোকের কি সমস্যা কমে গেলো? ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ,স্বামী স্ত্রী ঝগড়া,জমি দখলের লড়াই এসবের বিচার করে রতন।তার সাগরেদ রা কড়া নজর রাখে।

আজ মোটে দুটো ঘর এলো।সালিশি শেষ করে রতন নন্দার বাড়ির দিকে পা চালায়। ওরা কি রতনের দোকানে গেলো?

            রতন কামারের  হাত শক্ত ,দাগ আর ফোস্কা।

 মা-টা মরে একদিকে তার ভার কমেছে।বোনটার কথা মনে পড়লে চোয়াল শক্ত,হাতের পেশি ফুলে ওঠে।কামারপাড়ার দিকে যেতে যেতে মুখোমুখি হয় অন্ধকারে একদিন রতনবাবুর।পাশ দিয়ে চলে যান হন হন করে।আজও  বলা হলো না বন্ধকের জমিটার কত দেনা আর বাকি। পেছন পেছন কিছুটা ফিরে যায় লোকটাকে ধরার জন্য।

রতনের হঠাৎ বুকটা ধড়াস।ছোটোলোকটার চোখ দুটো কেমন জ্বলছিলো।নাকি তার মনের ভুল।পেছনে পায়ের শব্দ।ওই ত আসছে রতন কামার।পেছু নিয়েছে।এদিকটা ঝোপঝাড় বিশেষ বসতি নেই।যদি হাতে দা থাকে আর ......ছুটতে থাকে রতন বিপুল শরীর নিয়ে।

        এসি চলছে।ডাক্তার এসেছে।কদিন শরীরটা ভালো নেই।চোখ লাল।প্রেশার বেড়েছে।

      ঠং ঠং ঠং..রোজ ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়ে  শব্দটা

তাঁর বুকেই যেন হাতুড়ি পেটে । বারান্দায় যাওয়া বন্ধ। গেলেই মনে হয় পথের বাঁকে দু জোড়া জ্বলন্ত চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে।

ও কি জেনে ফেলেছে জমিটার দেনা কবেই শোধ হয়ে গেছে ,নিজের নামে বেদখল করে নিয়েছে সে.....অথবা পনের বছর  আগের সেই আত্মহত্যা... রতনের বোন রত্নার!

পেটে ত তারই...

নিজেকেই বিড় বিড় করেন সামনে নির্বাচন কিবা করার ছিলো।কামার বস্তির ছোটোলোকের মেয়ে.....এসব সম্পর্ক পাবলিক নিত না।

ক্রমশ কৃশ হতে থাকেন রতন। ক্রমশ আরো জোরে পড়ে আগুনে হাঁপর।

পুজো আসছে। 

রতনবাবুর বড়ো পুত্র তৈরী হয়।সিটটা তার ন্যায্য দাবী।রতন কাউকে বলতে পারেন না তাঁর আতঙ্কের কথা।

       দিনরাত আজকাল স্বপ্ন দেখেন অট্টালিকা নেই তিনি কামার হয়ে গেছেন,জমিহীন...

মহালয়ার পরদিন হাতুড়ির চরম ঘা পড়লো অবশেষে।

 এলাকার নেতা ও সমাজসেবী রতন বাবুর মৃত্যুতে বিরাট মিছিল,শোকের বিজ্ঞাপন।

রতন কামারের দোকানের সামনে দিয়ে শবযাত্রা চলে যায়।কিছু খই উড়ে আসে তার দিকে।

          পাথরে কোঁদা কালো শরীরে পেশিগুলো ওঠে নামে। মুখে, কপালে ঘাম। ঘাম গড়িয়ে পড়ে নগ্ন লোমশ বুকটা বেয়ে।

ঠং ঠং ঠং ঠং...

 শব্দটা বন্ধ হয় না।




মদনের প্রেম

 




মদনের প্রেম

তাপসকিরণ রায়


মদনের মন আছে বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলেও বিবাহ বন্ধন তাকে বাঁধতে পারেনি। মনের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরটাও নাকি এমন তর নিষ্পাপ ছিল।  

মালতি বলেছিল,  এত ভালো ছেলে আজকাল মানায় না গো !

মদন বলেছিল, বিয়ের আগে নায়িকাকে চুমু খাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না--

এত আলতো স্বভাবের মানুষটা প্রেমের উপযুক্ত নয়, ভেবে মালতি মদনের সঙ্গ ছেড়ে ছিল। 

প্রমা এল, সুন্দরী মেয়ে দেখে মদনই এগিয়ে ছিল।  বলেছিল,  প্রমা তুমি খুব সুন্দরী গো !

--কেমন ? হেসে প্রশ্ন করেছিল প্রমা।

--তোমায় দেখলে  বেশ সতীলক্ষী বলে মনে হয়--

প্রমা আর এক পা-ও এগোয় নি, মদনের ভাষা একেবারেই জুতসই বলে তার মনে হয়নি।  এই যে আদ্দিকালের এক বুড়ো হাবড়া !

তারপর স্মৃতি এলো, প্রেম চলছিল বেশ, স্বভাবে চলনে-বলনে অনেকটাই মদনের ধারেকাছ ঘেঁষা বলে মনে হয়েছিল।  সেখানেও বাঁধ সাধলো, একদিন আবেগের বশে স্মৃতি মদনের হাত  ছুঁয়ে  দিয়েছিল। মদন সঙ্গে সঙ্গে তিড়িং করে পিছ-পা একটা লাফ দিয়ে মুখ কেটে বলেছিল, এমন ছোঁয়া-ঘাটা মেয়ে আমার একদম পছন্দ নয়।

না, এমনটা চলবে না, তার চেয়ে গ্রামের মেয়ে হোক--হোক না সে আদিবাসী মেয়ে।  সেও ভালো হবে অন্ততপক্ষে অচ্ছুৎ হবে। পবিত্র হবে, মাটির গন্ধ মাখা একটা মেয়ে হবে সে। হতে পারে মদনের মত আইবুড়ো ছেলের উপযুক্ত পাত্রী কিংবা প্রেমিকা।

আদিবাসী মেয়েটার নাম ছিল বুদনি। আদিবাসী মেয়ে হলে কি হবে, কালো হলেও সুন্দরী, আয়তো চোখে যখন মদনের দিকে সে  তাকিয়ে আধগাল হেসেছিল, ব্যাস তখনই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল মদন। 

এক চাঁদনী রাতে ওরা প্রাক-বিবাহের দৃষ্টি বিনিময়ে হাজির হয়েছিল এক কদম্ব গাছের তলে। আবেগের বশে বুদনি বারবার মদনের গা ঘেঁষার চেষ্টা করছিল কি ? মদন সরে যাচ্ছিল, কিন্তু বুদনির গায়ের গন্ধ তার ভালো লাগছিল। আহা মাটির গন্ধ, উগ্র নয়, সবে যেন বছরের প্রথম ক'ফোটা বৃষ্টি ঝরে পড়েছে গ্রাম্য মাটিতে।

গাছের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে দূর দিগন্তের এক ফালি চাঁদ বারবার ঝিলিক মেরে যাচ্ছিল। মদন মনে মনে ভাবছিল,  কি মায়াময় এই পৃথিবী--এ যেন রাধা-কৃষ্ণের মিলন--এটুকু ভেবে মদন থেমে গেল, আসলে এমন প্রেম যে সে চায় না। রাধা কৃষ্ণের প্রেম বড় গা-মাখামাখি প্রেম ছিল। সে জানে, সব সময় স্পষ্ট কথা বলা যায় না, আসলে দেব-দেবতাদের ক্ষেত্রে এ সব লীলাখেলা, কিন্তু মানুষের বেলায় চরিত্রস্খলন ছাড়া আর কি কিছু বলা যায় !  

এদিকে বুদনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে চলেছে, ও চাঁদ, তুমি আমারে কতবার ছুঁইছো, তাই তো আমার এই কালো রং এত গোরা হইছে গো !....

মদন ভাবছিল, আকাশের চাঁদের সঙ্গে বুদনি প্রেম করতেই পারে--বুদনির মত সহজ সরল মেয়ের  প্রকৃতির সঙ্গে প্রেম করা মানায় বটে ! 

এক সময় বুদনি কেঁদে ওঠে, আকাশের চাঁদের এত দূরত্বের বিরহে বুধনি বুঝি বিরহী হয়ে      উঠেছে...এক সময় বুদনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে….

মদন বুদনির দিকে এগিয়ে যায়, একহাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে সান্ত্বনার সুরে বলে ওঠে, কেঁদো না মেয়ে, ও চাঁদ তোমায় কোন দিন ছেড়ে যাবে না--

বুদনি বলে, না গো, সে চলে গেছে, আমার প্রেমের চাঁদ আমারে ছেইড়ে চলে গেছে--

মদন আঁতকে উঠল। এ কি শুনছে সে ! বুদনির প্রেমিক ছিল ? মদন বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে  দিকভ্রান্তের মত ছুটে চলেছে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে একবার সে উঁকি মেরে দেখল, আকাশের এক  কোণের সেই মরা চাঁদটাও এখন আর নেই। 

সমাপ্ত

নিরালায় একা...


 

নিরালায় একা...

........................

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

চোখ খুলতেই বর্ষার ঘোলা রঙের আকাশ মনখারাপ করাতে এল! মনে পড়ল আজ যে আমার জন্মতিথি! 

ততোক্ষণে ভরা বর্ষায় কালিন্দীর জল থইথই করেছে। থেকে থেকেই  আকাশ ছিঁড়ে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ।

আজ পথ ঘাট সব জনহীন।

.....

দূরে সশব্দে একটা বাজ পড়ল। যেন ভেঙে গেল একটা কল্পনার

দেওয়াল। তারপর স্পষ্ট দেখলাম একজন নারীকে।

সে বোধহয় সদ্য বিবাহিতা তবুও ইতিমধ্যেই  সন্তানবতী যেন! তার কোলের মধ্যে কাপড়ে জড়ানো একটা মানবসন্তান। আহা! ঠিক যেন একগোছা  ভোরের শিউলি ফুল। 

মেয়েটি এক হাতে আঁজলা করে ফুল গুলো এবার তার চারিদিকে নিয়ে ছড়িয়ে দিল।

....
সে ঠিক করেছে এবার থেকে শিশু সন্তানটিকেও কেবলই  নির্মোহ হতে  শেখাবে।

যেন এই বিশ্বচরাচরে তার আর নিজের বলে কিছুই রইবে না অথচ সব কিছুতেই সে থেকে যাবে।

সেটাই তো আসল শিক্ষা যা সে দিতে চায় তার ভাবী প্রজন্মকে।

এবারে দেখলাম হঠাৎ মেয়েটি আমার কানে কানে এসে  যেন ফিসফিস করে বলে উঠল, "ময়া তত্যমিদং সর্বং জগদব্যাক্তমূর্তিনা/মৎ স্হানি

সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্হিতঃ"

তার মানে এই যে আমি সবেতে থাকব অথচ সর্বভূতে মানে জগৎবিশ্বে আর  আমার নিজের বলে কিছুই থাকবে না....?

দেখলাম এবারে আমার তন্মধ্য  ঘুমঘোরটাও যেন ভেঙে গেছে।

............

২১শে আষাঢ়, ১৪২৮.



হিংস্র থাবায় আহত মন

 





হিংস্র থাবায় আহত মন            

রূপা বাড়ৈ                           


গভীর রাত, চারিদিকে নির্জনতা, আশেপাশে সকলে ঘুমে বিভোর। ঘুমের ঘোরে থাকা চন্দ্রা কি যেন একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে হঠাৎ জেগে যায়, শুয়ে থাকা থেকে উঠে বসে। অন্ধকার বিছানার চারিদিকে দু'হাতে হাতড়িয়ে তার একমাত্র ছোট্ট সন্তানকে খোঁজে। হাতের নাগালে না পেয়ে আলো জ্বালিয়ে দেখে সন্তান তার বাবার বুকের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে আছে। নিশ্চিন্ত হলো, কিন্তু কিছুতেই তার আর ঘুম আসছে না। তাই ব্যালকনিতে গিয়ে আঁধারিয়া প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখছে আর পায়চারি করছে। অর্ধ চাঁদ আকাশের গায়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, আর সেই আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে গাছের কালো কালো পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। অবাক করা পরিবেশ, চন্দ্রার কেনো যেন মনে হচ্ছে, প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে। মনের অজান্তেই ঘর থেকে চন্দ্রা বাহিরে বেড়িয়ে আসে। কিছুটা পথ হেঁটে মেইন গেটের কাছে যেতেই তার কানে একটা শব্দ আসে, মনে হচ্ছে দুজন লোকের ধস্তাধস্তির শব্দ।

চন্দ্রা গেট খুলে দেখে তার পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী বৃদ্ধ কাকা তার নাতনিকে খুব মেরে চলেছে কিন্তু মেয়েটি শব্দ করতে পারছে না মার খেয়ে যাচ্ছে মুখ বুঝে। কারণ মেয়েটির মুখ কাপড়ে বাঁধা। মেয়েটি দৌড়ে এসে চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে বাঁচাও আমাকে মেরে ফেলবে। চন্দ্রাকে দেখে বৃদ্ধ থতমত খেয়ে বলে বড্ড অবাধ্য মেয়ে তাই শাসন করছি, চন্দ্রা তুমি ঘরে যাও।

একটা ছোট্ট কোদাল দিয়ে মেয়েটিকে মারছিলো, রেগে গিয়ে চন্দ্রা বৃদ্ধর হাত থেকে কোদাল'টা কেড়ে নিতেই বৃদ্ধ চন্দ্রার উপর ক্ষেপে যায়। এই শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ী থেকে একজন প্রতিবেশী কাকী বেড়িয়ে এসে বলে উনি আরো অনেকবার এই মেয়েটিকে মেরেছে আমি তার সাক্ষী তবে ওনার ব্যবহার এতো খারাপ যে আমি প্রতিবাদ করতে সাহস পাই নাই। দুজনে এই কথা বলতে বলতে চন্দ্রার বড় বোন এসে বলে তাকিয়ে দেখো বৃদ্ধ জোর করে রক্তাক্ত মেয়েটিকে একটা বড় বালতির মধ্যে ঢুকাচ্ছে। তিনজনে মিলে বৃদ্ধ'কে বাধা দিতে থাকে এমন সময় রাতে টহলকারী পুলিশের গাড়ি সামনে এসে থামিয়ে দেয়। তারা মেয়েটিকে উদ্ধার করে, এরপরে সকলের কাছে থেকে কিছু ঘটনা শুনে বৃদ্ধ'কে গাড়িতে তোলে। মেয়েটি সহ ওখানে উপস্থিত সকলকে গাড়িতে উঠে বসতে বলে। এর মধ্যে আশেপাশের অনেকেই আসে, চন্দ্রার স্বামীও আসে, সকলে সবকিছু জেনে হতভম্ব হয়ে যায়।

পুলিশ প্রথমে একটা ক্লিনিকে মেয়েটিকে চিকিৎসা করায়, তারপরে থানায় নিয়ে মেয়েটির কাছে থেকে বিস্তারিত শোনে। লোমহর্ষক কাহিনী শুনে সকলে তাজ্জব হয়ে যায়। ৭০ বছরের দাদাভাই তার প্রতি কি নির্মম অত্যাচার করেছে দিনের পর দিন। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বিস্তারিত বলতে থাকে, তার নিজের বাবা মারা যাবার পর দুই বছর আগে এই বৃদ্ধর ছেলেকে বিবাহ করে তার মা ৬ বছরের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ২য় স্বামীর ঘরে এসে সংসার করে।

এই দুই বছর ধরে মেয়েটি দাদাভাই'র ঘরে আলাদা খাটে ঘুমায়, কিন্তু প্রায় প্রতিরাতে বৃদ্ধ মেয়েটিকে বলাৎকার করে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলেই মার খায়, এভাবে দিন দিন অত্যাচার বেড়েই চলে, মা'কে বললে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে। এতোদিন চাপা  দিয়েছে যেন মা বুঝতে না পারে, কিন্তু এক মাস হয় প্রায় রাতে বাহিরে এনে খুব বেশি করে মেরে ঘরে নিয়ে বলাৎকার করে। আজ বলেছে মেরে গুম করে দেবে, কেউ টের পাবে না, তাই এই ছোট্ট কোদাল দিয়ে কুপিয়েছে। লোকজন না এলে হয়তো মেরেই ফেলতো, এই বলে মেয়েটি আর কিছু বলতে পারে না শুধু কেঁদেই চলেছে।

পুলিশ অফিসার সব শুনে চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বললো আপনাকে স্যালুট, এমন মানবিক মানুষের এখন খুব বেশি দরকার। এই সমাজের শরীরে লেগে থাকা কলুষিত দাগ মুছতে, কালিযুক্ত অসভ্য মানব চরিত্রকে সভ্যতায় ফেরাতে আর এই হিংস্র থাবা হতে নতুন প্রজন্ম'কে বাঁচাতে এমন প্রতিবাদী ইচ্ছাশক্তির মানুষ প্রয়োজন। আবারও বলছি, আপনাদের মতো এমন হৃদয়ের মানুষ খুব প্রয়োজন প্রকৃতির মতো সুন্দর সমাজ গড়তে। এসব বলার পর পুলিশ অফিসার একটি ডাইরি এগিয়ে দিয়ে বললেন কিছু নিয়ম পালন করতে হয় বলে এই ডাইরিতে লিখে দিয়ে যান বিস্তারিত ভাবে পূর্ণ ঘটনা ঐ সময়ে আপনাদের সম্মুখে কি ঘটেছিলো। আপনারাই প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী।

সম্পূর্ণ ঘটনা লিখতে লিখতে দেখা যায় মেয়েটির মা বাবা থানায় চলে এসেছে, মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে তার মা হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে আর তার ২য় বাবা পুলিশ অফিসার'কে বলেন- আমার খুব লজ্জা হচ্ছে এমন জঘন্য অপরাধকারীকে বাবা বলে স্বীকার করতে। তারপরেও বলছি এই অপরাধের জন্য তার যথাযথ বিচার হোক, বলেই কেঁদে ফেলেন। অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে থানা থেকে সকলে চলে যায়। রিমান্ডে বৃদ্ধ অকাতরে সব স্বীকার করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে

  অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে-- মানুষের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়ে বোধহয় তৈরি হয় গল্প। অবশ্য শুধু মানুষকে নিয়ে কেন, প্...