হিংস্র থাবায় আহত মন
রূপা বাড়ৈ
গভীর রাত, চারিদিকে নির্জনতা, আশেপাশে সকলে ঘুমে বিভোর। ঘুমের ঘোরে থাকা চন্দ্রা কি যেন একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে হঠাৎ জেগে যায়, শুয়ে থাকা থেকে উঠে বসে। অন্ধকার বিছানার চারিদিকে দু'হাতে হাতড়িয়ে তার একমাত্র ছোট্ট সন্তানকে খোঁজে। হাতের নাগালে না পেয়ে আলো জ্বালিয়ে দেখে সন্তান তার বাবার বুকের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে আছে। নিশ্চিন্ত হলো, কিন্তু কিছুতেই তার আর ঘুম আসছে না। তাই ব্যালকনিতে গিয়ে আঁধারিয়া প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখছে আর পায়চারি করছে। অর্ধ চাঁদ আকাশের গায়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, আর সেই আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে গাছের কালো কালো পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। অবাক করা পরিবেশ, চন্দ্রার কেনো যেন মনে হচ্ছে, প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে। মনের অজান্তেই ঘর থেকে চন্দ্রা বাহিরে বেড়িয়ে আসে। কিছুটা পথ হেঁটে মেইন গেটের কাছে যেতেই তার কানে একটা শব্দ আসে, মনে হচ্ছে দুজন লোকের ধস্তাধস্তির শব্দ।
চন্দ্রা গেট খুলে দেখে তার পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী বৃদ্ধ কাকা তার নাতনিকে খুব মেরে চলেছে কিন্তু মেয়েটি শব্দ করতে পারছে না মার খেয়ে যাচ্ছে মুখ বুঝে। কারণ মেয়েটির মুখ কাপড়ে বাঁধা। মেয়েটি দৌড়ে এসে চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে বাঁচাও আমাকে মেরে ফেলবে। চন্দ্রাকে দেখে বৃদ্ধ থতমত খেয়ে বলে বড্ড অবাধ্য মেয়ে তাই শাসন করছি, চন্দ্রা তুমি ঘরে যাও।
একটা ছোট্ট কোদাল দিয়ে মেয়েটিকে মারছিলো, রেগে গিয়ে চন্দ্রা বৃদ্ধর হাত থেকে কোদাল'টা কেড়ে নিতেই বৃদ্ধ চন্দ্রার উপর ক্ষেপে যায়। এই শব্দ পেয়ে পাশের বাড়ী থেকে একজন প্রতিবেশী কাকী বেড়িয়ে এসে বলে উনি আরো অনেকবার এই মেয়েটিকে মেরেছে আমি তার সাক্ষী তবে ওনার ব্যবহার এতো খারাপ যে আমি প্রতিবাদ করতে সাহস পাই নাই। দুজনে এই কথা বলতে বলতে চন্দ্রার বড় বোন এসে বলে তাকিয়ে দেখো বৃদ্ধ জোর করে রক্তাক্ত মেয়েটিকে একটা বড় বালতির মধ্যে ঢুকাচ্ছে। তিনজনে মিলে বৃদ্ধ'কে বাধা দিতে থাকে এমন সময় রাতে টহলকারী পুলিশের গাড়ি সামনে এসে থামিয়ে দেয়। তারা মেয়েটিকে উদ্ধার করে, এরপরে সকলের কাছে থেকে কিছু ঘটনা শুনে বৃদ্ধ'কে গাড়িতে তোলে। মেয়েটি সহ ওখানে উপস্থিত সকলকে গাড়িতে উঠে বসতে বলে। এর মধ্যে আশেপাশের অনেকেই আসে, চন্দ্রার স্বামীও আসে, সকলে সবকিছু জেনে হতভম্ব হয়ে যায়।
পুলিশ প্রথমে একটা ক্লিনিকে মেয়েটিকে চিকিৎসা করায়, তারপরে থানায় নিয়ে মেয়েটির কাছে থেকে বিস্তারিত শোনে। লোমহর্ষক কাহিনী শুনে সকলে তাজ্জব হয়ে যায়। ৭০ বছরের দাদাভাই তার প্রতি কি নির্মম অত্যাচার করেছে দিনের পর দিন। মেয়েটি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বিস্তারিত বলতে থাকে, তার নিজের বাবা মারা যাবার পর দুই বছর আগে এই বৃদ্ধর ছেলেকে বিবাহ করে তার মা ৬ বছরের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ২য় স্বামীর ঘরে এসে সংসার করে।
এই দুই বছর ধরে মেয়েটি দাদাভাই'র ঘরে আলাদা খাটে ঘুমায়, কিন্তু প্রায় প্রতিরাতে বৃদ্ধ মেয়েটিকে বলাৎকার করে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলেই মার খায়, এভাবে দিন দিন অত্যাচার বেড়েই চলে, মা'কে বললে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে। এতোদিন চাপা দিয়েছে যেন মা বুঝতে না পারে, কিন্তু এক মাস হয় প্রায় রাতে বাহিরে এনে খুব বেশি করে মেরে ঘরে নিয়ে বলাৎকার করে। আজ বলেছে মেরে গুম করে দেবে, কেউ টের পাবে না, তাই এই ছোট্ট কোদাল দিয়ে কুপিয়েছে। লোকজন না এলে হয়তো মেরেই ফেলতো, এই বলে মেয়েটি আর কিছু বলতে পারে না শুধু কেঁদেই চলেছে।
পুলিশ অফিসার সব শুনে চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বললো আপনাকে স্যালুট, এমন মানবিক মানুষের এখন খুব বেশি দরকার। এই সমাজের শরীরে লেগে থাকা কলুষিত দাগ মুছতে, কালিযুক্ত অসভ্য মানব চরিত্রকে সভ্যতায় ফেরাতে আর এই হিংস্র থাবা হতে নতুন প্রজন্ম'কে বাঁচাতে এমন প্রতিবাদী ইচ্ছাশক্তির মানুষ প্রয়োজন। আবারও বলছি, আপনাদের মতো এমন হৃদয়ের মানুষ খুব প্রয়োজন প্রকৃতির মতো সুন্দর সমাজ গড়তে। এসব বলার পর পুলিশ অফিসার একটি ডাইরি এগিয়ে দিয়ে বললেন কিছু নিয়ম পালন করতে হয় বলে এই ডাইরিতে লিখে দিয়ে যান বিস্তারিত ভাবে পূর্ণ ঘটনা ঐ সময়ে আপনাদের সম্মুখে কি ঘটেছিলো। আপনারাই প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী।
সম্পূর্ণ ঘটনা লিখতে লিখতে দেখা যায় মেয়েটির মা বাবা থানায় চলে এসেছে, মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে তার মা হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে আর তার ২য় বাবা পুলিশ অফিসার'কে বলেন- আমার খুব লজ্জা হচ্ছে এমন জঘন্য অপরাধকারীকে বাবা বলে স্বীকার করতে। তারপরেও বলছি এই অপরাধের জন্য তার যথাযথ বিচার হোক, বলেই কেঁদে ফেলেন। অসুস্থ মেয়েটিকে নিয়ে থানা থেকে সকলে চলে যায়। রিমান্ডে বৃদ্ধ অকাতরে সব স্বীকার করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

No comments:
Post a Comment