ঘাম
____
জয়িতা ভট্টাচার্য
রতনে রতন চেনে কথাটা ভয়ানক ভাবে সত্য।অন্তত পটাশপুর ৪নং গ্রাম পঞ্চায়েত এর শিখণ্ডিপাড়ায় ত বটেই।
এ হেন নামই বা এলাকাটির কে রেখেছিলো আজ আর জানার উপায় নেই তবে কার্যকারণে যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়।
রতন সেন শক্তিশালী নেতা তার অট্টালিকার বারান্দায় বসে দার্জিলিং চায়ের সঙ্গে ফুলকো লুচিসহ আলুরদম খেতে খেতে একথাই ভাবছিল।এমনিতে গ্রামটা বেশ সুন্দর।ছোটো ছোটো বাড়ি,মাটির বা টালির একটা দুটো একতলা পাকা ঘর,মাটির রাস্তা এবড়োখেবড়ো, কাঁচা নয়ানজুলি আর বট অশত্থ সজনে আরো কত গাছ।একটা গ্রাম ত এমনই হবার কথা।
পয়সা নষ্ট সে হতে দেয়নি।পাকা সড়ক,ড্রেন,ইত্যাদি গ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করে।বাড়িটা তাই আড়ে বহরে বেড়েছে।বছর বছর রং।ঝকঝকে।শুধু......শধু ওই পথের বাঁকে রতন কামারের দোকানটা.....।সব সময় ভিড়।আড্ডা।আলোচনা।শুনেছে রতন হরেক রকম আরো কাজ করে।
এ গ্রামে তাই রতন বলতে কামার কে বোঝে প্রথমত লোকে তারপর রতনবাবুর খোঁজ মানে রতন সেন।ব্যাপারটা যারপরনাই বিশ্রী।
হাঘরের বেটা।ছোটোলোক যেমন হয়।করিস ত কামারের কাজ।বামন হয়ে চাঁদে হাত..........
___"দাদা নীচে লোক অপেক্ষা করছে।আজ আপনার কান্তাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির বৈঠক"
__" তারপর?"
__"দাদা ওটা যেতে আসতে তিনটে হয়ে যাবে।বিকেলে মাঠে যেমন বসেন.....দু চারটে কেস আছে ওগুলো...."
__"ওঠো দেরি হয়ে। যাবে চা আর বাসি রুটি দুখান খেও।"
বউ বাবুর বাড়ি কাজে চলে যায়।
রতন জেগেছে অনেক্ষণ।ভাবছে।অনেক কিছু ভাবছে।কূলকিনারা নেই তার।বাইরের কুয়াশা মনে ছেয়ে আছে ।পুকুর থেকে স্নান করে সব সেরে দোকান খোলে।তার দোকান সবার আগে খোলে।
তারপর হাঁপরে পিটতেই থাকে।আগুনটা জ্বলে ধিকি ধিকি।হাতুড়ির ঘা।কাস্তে কুড়ুল দা পড়ে আছে। সকালের খদ্দেরের চেয়ে রাতের খদ্দের বেশি ইদানিং।
মাঠের পাড়ে সালিশি সভা।ভিড় যেন পাতলা? লোকের কি সমস্যা কমে গেলো? ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ,স্বামী স্ত্রী ঝগড়া,জমি দখলের লড়াই এসবের বিচার করে রতন।তার সাগরেদ রা কড়া নজর রাখে।
আজ মোটে দুটো ঘর এলো।সালিশি শেষ করে রতন নন্দার বাড়ির দিকে পা চালায়। ওরা কি রতনের দোকানে গেলো?
রতন কামারের হাত শক্ত ,দাগ আর ফোস্কা।
মা-টা মরে একদিকে তার ভার কমেছে।বোনটার কথা মনে পড়লে চোয়াল শক্ত,হাতের পেশি ফুলে ওঠে।কামারপাড়ার দিকে যেতে যেতে মুখোমুখি হয় অন্ধকারে একদিন রতনবাবুর।পাশ দিয়ে চলে যান হন হন করে।আজও বলা হলো না বন্ধকের জমিটার কত দেনা আর বাকি। পেছন পেছন কিছুটা ফিরে যায় লোকটাকে ধরার জন্য।
রতনের হঠাৎ বুকটা ধড়াস।ছোটোলোকটার চোখ দুটো কেমন জ্বলছিলো।নাকি তার মনের ভুল।পেছনে পায়ের শব্দ।ওই ত আসছে রতন কামার।পেছু নিয়েছে।এদিকটা ঝোপঝাড় বিশেষ বসতি নেই।যদি হাতে দা থাকে আর ......ছুটতে থাকে রতন বিপুল শরীর নিয়ে।
এসি চলছে।ডাক্তার এসেছে।কদিন শরীরটা ভালো নেই।চোখ লাল।প্রেশার বেড়েছে।
ঠং ঠং ঠং..রোজ ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়ে শব্দটা
তাঁর বুকেই যেন হাতুড়ি পেটে । বারান্দায় যাওয়া বন্ধ। গেলেই মনে হয় পথের বাঁকে দু জোড়া জ্বলন্ত চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ও কি জেনে ফেলেছে জমিটার দেনা কবেই শোধ হয়ে গেছে ,নিজের নামে বেদখল করে নিয়েছে সে.....অথবা পনের বছর আগের সেই আত্মহত্যা... রতনের বোন রত্নার!
পেটে ত তারই...
নিজেকেই বিড় বিড় করেন সামনে নির্বাচন কিবা করার ছিলো।কামার বস্তির ছোটোলোকের মেয়ে.....এসব সম্পর্ক পাবলিক নিত না।
ক্রমশ কৃশ হতে থাকেন রতন। ক্রমশ আরো জোরে পড়ে আগুনে হাঁপর।
পুজো আসছে।
রতনবাবুর বড়ো পুত্র তৈরী হয়।সিটটা তার ন্যায্য দাবী।রতন কাউকে বলতে পারেন না তাঁর আতঙ্কের কথা।
দিনরাত আজকাল স্বপ্ন দেখেন অট্টালিকা নেই তিনি কামার হয়ে গেছেন,জমিহীন...
মহালয়ার পরদিন হাতুড়ির চরম ঘা পড়লো অবশেষে।
এলাকার নেতা ও সমাজসেবী রতন বাবুর মৃত্যুতে বিরাট মিছিল,শোকের বিজ্ঞাপন।
রতন কামারের দোকানের সামনে দিয়ে শবযাত্রা চলে যায়।কিছু খই উড়ে আসে তার দিকে।
পাথরে কোঁদা কালো শরীরে পেশিগুলো ওঠে নামে। মুখে, কপালে ঘাম। ঘাম গড়িয়ে পড়ে নগ্ন লোমশ বুকটা বেয়ে।
ঠং ঠং ঠং ঠং...
শব্দটা বন্ধ হয় না।

No comments:
Post a Comment