সকালে উদগ্রীব এসে ঘুমের থেকে জাগিয়ে তুললো তপস্তুভ কে। "কিরে, উঠিস নি এখনো? যাবিনা রুদ্রান্তদের ওখানে?" কম্বল সরিয়ে উঠে বসে বিস্ময়ের মুখে তপস্তুভ বলে,"কেন, কি আছে আজ ওখানে?"
"ওমা, সেকি, তুই জানিস না? আজ না কবি শ্যামলতনু তন্তুবায়ের আসার কথা!"
"কে শ্যামলতনু?"
"সত্যি মাইরি! তুই না কোনো খোঁজখবরই রাখিস না!"
"আরে অত ভনিতা না করে বলনা।"
"আরে গান্ডু, শ্যমলতনু হচ্ছে এখন সেই লোক যার হাতে প্রচুর ক্ষমতা ! রাজ্যের কবিদের অন্যতম আরাধ্য এখন উনি।"
"সেটা কিরকম?"
"আরে গাধা, আমরা যারা এদিক থেকে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা পাঠাই, সেগুলির প্রকাশের দায়িত্বে তো এখন উনিই থাকেন! উনার হাত থেকে বেরোলে তবেই সেটা ছাপা হবে। আর একবার কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে কবিতা বের হলে তো বুঝতেই পারছিস!"
"ও, তাই নাকি? তা হঠাৎ রুদ্রান্তদের ওখানে উনি আসছেন কেন?"
"আরে, রুদ্রান্তর বেশ কয়েকটা কবিতা বেরিয়েছে না কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে ! ওর সাথে তো উনার খুব ভালো সম্পর্ক এখন। তা উনি দার্জিলিং গেছিলেন, তাই ফেরার পথে এখানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তাই তার সৌজন্যে রুদ্রান্তদের ওখানে আজ একটা সাহিত্য আসর। সবাই যাচ্ছে। চল, যদি যোগাযোগ করে কিছু একটা করতে পারা যায়!"
তপস্তুভ নিজেও কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠিয়েছে, কিন্তু ছাপেনি। ও জানে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে একবার কবিতা ছাপা হলেই এদিককার কবিরা জাতে উঠে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকে মানে কি, প্রকৃতপক্ষে সবাইই। একমাত্র তপস্তুভ ওসব ভাবেনা। তবে এদেরকে দেখানোর জন্য ও নিজেই বাইপোস্টে কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে চার পাঁচটি কবিতা পাঠিয়েছিল। ছাপেনি। ভেতরের গল্প যে এতকিছু, তা তো অতটা সে জানেনা। তপস্তুভ এখানে যারা যত লেখে তাদের সবার চাইতে ও বেশ অন্যরকম। বাংলা কবিতার বিবর্তনের ধারা বুঝে ও আগামীর কবিতাই এখন লিখছে। ওর খিদেটা অন্যরকম। যাইহোক, ভদ্রলোককে দেখে আসার জন্য না হয় সে যাবে। যথারীতি দুপুরে খেয়েদেয়ে, জিন্সের প্যান্টের উপর একটা গেঞ্জি গায়ে সাইকেল নিয়ে তপস্তুভ বেরিয়ে পড়ে। লেখার ডায়েরি নিল না। মোবাইলেই দু চারটে লেখা আছে, আর স্বরচিত অনেক কবিতা ওর স্মৃতিতেই থাকে। প্রয়োজন হলে পড়বে, না হলে পড়বে না। ও তো যাচ্ছে এখানকার কবিকূলের হ্যাংলামোপনা দেখতে আর ব্যাপারটা কি সেটা এনজয় করতে।
রুদ্রান্তদের ওখানে আজ সিঁড়িতেই যত চটি জুতো দেখা যাচ্ছে, হলঘর যে ভিড়ে ঠাসা ও বেশ বুঝতে পারে। বসল গিয়ে শেষের এক বেঞ্চিতে। ততক্ষণে ব্যক্তিপূজোর সমাপ্তি ঘটে গেছে। লোকাল কবিদের পড়াও প্রায় শেষ। তপস্তুভকে পেছনে বসতে দেখে একজন বলেই উঠলো, আরে ওই তো তপস্তুভদা এসে গেছে, ওর কবিতা শুনি এবার। তপস্তুভ বড় অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে জানায় তার আজ শরীরটা ভালো নেই। সে শুধু দেখতে এসেছে, কবিতা সঙ্গে আনেনি। শ্যমলতনু বাবুর কথা ও কবিতা শোনাতেই ওর আগ্রহ বেশি। অগত্যা শ্যামলতনু তন্তুবায়ের সমাপ্তি ভাষণ ও কবিতা পাঠ। শ্যামলতনু বাবু এখানকার কবিদের লেখালেখির জন্য আরো উৎসাহ দিয়ে বেশ কিছু সুপরামর্শ দিয়ে কবিতা পাঠ শুরু করলেন। তপস্তুভ অবাক হয়ে শুনতে থাকে। শ্যামলতনু বাবুর প্রতিটি কবিতাই ওর খুব চেনা চেনা লাগে। মনে হয়, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইতো, এর পরের শব্দটা এরকমই হবে। এই তো এরকমই সে কয়েকটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিল কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে। কবিতা পড়ার পর সমবেতদের সেল্ফি তোলার উৎসাহের ভিড়ে হারিয়ে যান শ্যামলতনু বাবু। তপস্তুভ ততক্ষণে সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথে, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় সে, আর কোনো দিন কাঙ্ক্ষিতলক্ষ্যে বা কোথাও আগাম কবিতা পাঠাবে না। তেমনভাবে কেউ না চাইলে কোথাও ওর লেখা আর দেবে না। শুধু নিরলসভাবে ও লিখে যাবে।

এ এক আশ্চর্য মনস্তত্ত্ব!অন্যের সৃষ্টিকে আত্তিকরণ করে কিসের সন্তোষ!ধরা তো পড়তেই হয় একসময়। লেখককে ধন্যবাদ জ্বলন্ত এই সমস্যা তুলে ধরার জন্য।
ReplyDelete