কোভিড--19
বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল
আমাদের দুইটি পাখি ছিল, একটা টিয়া আর একটা মযনা। ওরা আলাদা আলাদা খাঁচায় থাকত। টিয়াটার নাম মিঠু আর ময়নাটার নাম সুন্দরী।
মিঠু উড়ে এসে পড়েছিল আমাদের ছাতে। মে মাসের ৩১ তারিখ ২০১০ সালের কথা, সে দিনই আমি সিংগাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ঘুরে বিকালে ঘরে পৌছে ছিলাম। ওখানে আমি চিড়িয়াখানায় অনেক পশু পাখি, জীবজন্তু ময়না টিয়া দেখেছিলাম। আমি বললাম, আরে টিয়াটা কি থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে জংগল চিড়িয়াখানা থেকে আমার সাথে উড়ে এল !
যাইহোক সে দিন থেকে মিঠু আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেল। বোধহয় ও কারো পোষা ছিল কারণ ওর দুই পাশের ডানাগুলি বেশ যত্ন করে ছোট করে ছাঁটা। নতুন অতিথি হিসেবে মিঠুকে নিয়ে পরিবারে একটা উৎসাহের আলোড়ন চলতে থাকে। আমার ছোট ভাই পেযারা আপেল কলা টুকরো টুকরো করে কেটে বেশ একটা ডেজার্ট তৈরি করে ছোট একটা বাটিতে ওর খাঁচায় রেখে দিত।
আমার ছোট নাতনি জলি বেশ কিছু পাকা লাল লংকা খাঁচার ভিতর রেখে দিযে মিঠুর দিকে তাকিয়ে থাকত। মিঠু এত সব খাবারের আয়োজন দেখে ও আমাদের দিকে তাকাত আর ফল কাঁচা পাকা লাল লংকার দিকে তাকিয়ে খাঁচার ভিতর এধার ওধার পায়চারি করত। খেত না। আমারা সবাই সামনে থেকে চলে গেলে ও খেত। বুঝতে পারতাম খেয়েছে।
প্রায় ছয় মাস পরে এক দিন সকালে আমার ছোট ভাই ময়নাটাকে হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলো, বলল, দাদা পাখিটাকে জংগল থেকে একটা লোক ধরেছিল আমাকে পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করেছে। ময়নাটার ছোট গলার চারিদিকে একটা সোনালী রেখা মালার মতো গলায় যেন পরে রয়েছে। দিদি পাখিটাকে দেখে বললো, আরে সুন্দরী ময়নাটা তো ! আর সেই থেকেই ময়নাটার নাম সুন্দরী হয়ে গেল।
নভেম্বরের শেষের দিকে আমার ভাই বলল, দাদা বুলবুল আসছে।
আমি বললাম, কি ব্যাপার আর একটা পাখি পেলি নাকি ?
--না দাদা, এ বুলবুল ভয়ঙ্কর এক সামুদ্রিক পাখি, একে মানুষের সাধ্য নাই পোষ মানায়। এ আসছে পৃথিবীর যত অন্যায় অবিচারের প্রতিশোধ নিতে। বন্ধন ও পরাধীন করা সব জীবকে মুক্ত করতে। ভযংকর তার গতি, পরাধীনরা মুক্তি পাবে, বন্ধনের বন্ধন খুলে প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেবে।
আমি ভয়ভীত হয়ে বললাম, কি এই বুলবুল পাখি, তার এতো আক্রোশ কেন ?
সে দিন সন্ধ্যা হতে হাওয়ার তেজ বেড়ে গেল, ভীষণ ভাবে চারিদিকে বজ্রপাত তারপর অঝোরে বৃষ্টি। যেন মহাপ্রলয়। সমুদ্র ফুলে ফেঁপে অজগরের গর্জন করতে লাগল। আমারা দরজা জানালা বন্ধ করে প্রবল উৎকন্ঠায় রাত কাটালাম।
সকালে বর্ষা থামলেও হাওয়ার গতি বেশ জোরালো।
এই ভাবেই বেশ চলছিল। প্রায় দশ বছর মিঠু আর সুন্দরী পাশাপাশি খাঁচায় বাস করত। মানুষের মতই ওদের স্নান খাওয়া চলতে লাগল। ওরা অজন্তে পরিবারের এমন সদস্য হয়ে গেল যে বিগত দশ বছরে পরিবারের হাসি কান্না সুখ দুঃখের সাথী হয়ে রইলো।
মিঠু আর সুন্দরী ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেছে। ভাবছে বুলবুল কি তাদের সাথী পাখি না প্রকৃতির কোন অভিশপ্ত পরি যার ডানার ঝাপটায় যত অন্যায় অবিচার ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।
বদ্ধ জীবজন্তুদের বন্ধন খুলে মুক্তি দিতে এসেছে। যেন বলছে ওরে মিঠু সুন্দরী তোরা মানুষের ছদ্ম মায়ায় না ভুলে খাঁচা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আয়।
বুলবুল তার আক্রোশ মিটিয়ে চলে গেল--অনেক ক্ষয়ক্ষতি ভাংচুর প্রাণ বিয়োগও হয়ে গেল। আমার ভাই বলল, দাদা এ ঘরটায় আর থাকা যাবে না। চলো আমাদের যে ফ্ল্যাটটা আছে ভাড়াটে উঠিয়ে সেখানে গিয়ে থাকি তারপর ঘরটা রিপেয়ার করে আবার এখানে এসে থাকব। তিন মাসের মধ্যে আমরা ফ্ল্যাটে আদ্ধেক জিনিসপত্র নিয়ে উঠলাম। মিঠু আর সুন্দরী এ ঘরে থাকতো সিঁড়ি ঘরে পাশাপাশি খাঁচার ভিতর। ফ্ল্যাটে ওদের জায়গা হলো ডাইনিং হলের জানালার নীচে। ডাইনিং টেবিলটার অনেকটা পাশেই। আমি যখনই ব্রেকফাস্টে বসতাম মিঠু অমনি চেঁচাত, মিঠু খাবে মিঠু খাবে বলে। আমি খাওয়া থেকে উঠে ওদের ফল অন্য খাবার মিঠু আর সুন্দরীকে দিতাম।
২০১৯-এর মার্চ মাসে মানুষ হঠাৎ আক্রান্ত হল কি এক অজানা রোগে। সবারই মুখে মাস্ক বারবার হাত ধোয়া যত সাফ সাফাই থাকার ব্যবস্থা। কোন পশুপাখি আক্রান্ত হল না। দীপ জ্বালানো থালা বাজানো শংখ ধ্বনি কত কি চলল। আক্রান্তের প্রথম ভাগ দ্বিতীয় ভাগের শেষের দিকে এখন delta + , কি দুর্দান্ত প্রকৃতির পরিমাপ। কত প্রিয়জন কত আপনার কাছের লোক দুরে বহু দুরে চলে গেল। কত আকুতি কত কান্না--প্রকৃতি অশান্ত। তার সংশোধনের কাজ চলতে লাগল। সবাই আমরা এক নীরব দর্শক হয়ে দেখছি। বৈজ্ঞানিক প্রাকৃতিক চিকিৎসা সবই চলছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি শুধুই অপেক্ষা করছি প্রকৃতির হিসাব কবে মিলবে।
এই দুই মাস আগে যথারীতি ব্রেকফাস্টের সময় আপেল ভেংগে দুটুকরো করে মিঠু আর সুন্দরীকে দিতে গেলাম। কিন্তু এ কি খাঁচা কোথায় মিঠু আর সুন্দরী কোথায় ? জায়গা ফাঁকা। তখনই আমার নাতনি জলি এসে বলল, দাদু মিঠু আর সুন্দরীকে বাবা নন্দন কাননে অন্য পাখিদের সাথে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ফলের টুকরো হাথে আমি কিছু সময় অপলক তাকিয়ে থাকলাম। আমার হঠাৎ মনে হল, তা হলে কি আমরা অসংখ্য মিঠু আর সুন্দরীদের প্রকৃতির পরিবেশে না রেখে ওদের আমাদের ইচ্ছে বা শখ পুরনের জন্য প্রকৃতির বিরূপের ও আক্রোশের শিকার হয়েছি ? মনে মনে বললাম, ভালোই হয়েছে মিঠু আর সুন্দরী তোমারা প্রকৃতির নির্মল পরিবেশে গাছগাছালির ভিতর তোমাদের সুরে আবার গান গাও। পৃথিবী শান্ত হোক, সুস্থ হোক।
কোভিদ 19 কি পাখিদেরও প্রভাবিত করতে পারে? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছয় নি। তবে মানুষতো কভিদ 19 এ প্রভাবিত। তাই ঘরে পোষা পাখির ওপর কভিদের অপ্রত্যক্ষ প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। বর্তমান গল্প অনেকটা এই পরিবেশে প্রভাবিত হয়েছে। গল্পটা বেশ ভালো লাগলো।
ReplyDelete