Monday, 5 July 2021

মদনের প্রেম

 




মদনের প্রেম

তাপসকিরণ রায়


মদনের মন আছে বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলেও বিবাহ বন্ধন তাকে বাঁধতে পারেনি। মনের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরটাও নাকি এমন তর নিষ্পাপ ছিল।  

মালতি বলেছিল,  এত ভালো ছেলে আজকাল মানায় না গো !

মদন বলেছিল, বিয়ের আগে নায়িকাকে চুমু খাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না--

এত আলতো স্বভাবের মানুষটা প্রেমের উপযুক্ত নয়, ভেবে মালতি মদনের সঙ্গ ছেড়ে ছিল। 

প্রমা এল, সুন্দরী মেয়ে দেখে মদনই এগিয়ে ছিল।  বলেছিল,  প্রমা তুমি খুব সুন্দরী গো !

--কেমন ? হেসে প্রশ্ন করেছিল প্রমা।

--তোমায় দেখলে  বেশ সতীলক্ষী বলে মনে হয়--

প্রমা আর এক পা-ও এগোয় নি, মদনের ভাষা একেবারেই জুতসই বলে তার মনে হয়নি।  এই যে আদ্দিকালের এক বুড়ো হাবড়া !

তারপর স্মৃতি এলো, প্রেম চলছিল বেশ, স্বভাবে চলনে-বলনে অনেকটাই মদনের ধারেকাছ ঘেঁষা বলে মনে হয়েছিল।  সেখানেও বাঁধ সাধলো, একদিন আবেগের বশে স্মৃতি মদনের হাত  ছুঁয়ে  দিয়েছিল। মদন সঙ্গে সঙ্গে তিড়িং করে পিছ-পা একটা লাফ দিয়ে মুখ কেটে বলেছিল, এমন ছোঁয়া-ঘাটা মেয়ে আমার একদম পছন্দ নয়।

না, এমনটা চলবে না, তার চেয়ে গ্রামের মেয়ে হোক--হোক না সে আদিবাসী মেয়ে।  সেও ভালো হবে অন্ততপক্ষে অচ্ছুৎ হবে। পবিত্র হবে, মাটির গন্ধ মাখা একটা মেয়ে হবে সে। হতে পারে মদনের মত আইবুড়ো ছেলের উপযুক্ত পাত্রী কিংবা প্রেমিকা।

আদিবাসী মেয়েটার নাম ছিল বুদনি। আদিবাসী মেয়ে হলে কি হবে, কালো হলেও সুন্দরী, আয়তো চোখে যখন মদনের দিকে সে  তাকিয়ে আধগাল হেসেছিল, ব্যাস তখনই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল মদন। 

এক চাঁদনী রাতে ওরা প্রাক-বিবাহের দৃষ্টি বিনিময়ে হাজির হয়েছিল এক কদম্ব গাছের তলে। আবেগের বশে বুদনি বারবার মদনের গা ঘেঁষার চেষ্টা করছিল কি ? মদন সরে যাচ্ছিল, কিন্তু বুদনির গায়ের গন্ধ তার ভালো লাগছিল। আহা মাটির গন্ধ, উগ্র নয়, সবে যেন বছরের প্রথম ক'ফোটা বৃষ্টি ঝরে পড়েছে গ্রাম্য মাটিতে।

গাছের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে দূর দিগন্তের এক ফালি চাঁদ বারবার ঝিলিক মেরে যাচ্ছিল। মদন মনে মনে ভাবছিল,  কি মায়াময় এই পৃথিবী--এ যেন রাধা-কৃষ্ণের মিলন--এটুকু ভেবে মদন থেমে গেল, আসলে এমন প্রেম যে সে চায় না। রাধা কৃষ্ণের প্রেম বড় গা-মাখামাখি প্রেম ছিল। সে জানে, সব সময় স্পষ্ট কথা বলা যায় না, আসলে দেব-দেবতাদের ক্ষেত্রে এ সব লীলাখেলা, কিন্তু মানুষের বেলায় চরিত্রস্খলন ছাড়া আর কি কিছু বলা যায় !  

এদিকে বুদনি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে চলেছে, ও চাঁদ, তুমি আমারে কতবার ছুঁইছো, তাই তো আমার এই কালো রং এত গোরা হইছে গো !....

মদন ভাবছিল, আকাশের চাঁদের সঙ্গে বুদনি প্রেম করতেই পারে--বুদনির মত সহজ সরল মেয়ের  প্রকৃতির সঙ্গে প্রেম করা মানায় বটে ! 

এক সময় বুদনি কেঁদে ওঠে, আকাশের চাঁদের এত দূরত্বের বিরহে বুধনি বুঝি বিরহী হয়ে      উঠেছে...এক সময় বুদনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে….

মদন বুদনির দিকে এগিয়ে যায়, একহাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে সান্ত্বনার সুরে বলে ওঠে, কেঁদো না মেয়ে, ও চাঁদ তোমায় কোন দিন ছেড়ে যাবে না--

বুদনি বলে, না গো, সে চলে গেছে, আমার প্রেমের চাঁদ আমারে ছেইড়ে চলে গেছে--

মদন আঁতকে উঠল। এ কি শুনছে সে ! বুদনির প্রেমিক ছিল ? মদন বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে  দিকভ্রান্তের মত ছুটে চলেছে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে একবার সে উঁকি মেরে দেখল, আকাশের এক  কোণের সেই মরা চাঁদটাও এখন আর নেই। 

সমাপ্ত

1 comment:

  1. সাবিত্রী দাস12 July 2021 at 05:55

    বেশ সুন্দর এক অন্যস্বাদের গল্প, পড়া শেষ হলেও রয়ে যায় একটা রেশ। শব্দের সুচারু বিন্যাস লেখকের মুন্সিয়ানাকে প্রমাণ করে দেয়।

    ReplyDelete

অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে

  অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে-- মানুষের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়ে বোধহয় তৈরি হয় গল্প। অবশ্য শুধু মানুষকে নিয়ে কেন, প্...