নীলার ভালোবাসা
সন্ধ্যা রায়
ডাক্তার চেক আপে আসছেন, বলে গেল নার্স। ডাক্তার নীলাক্ষী মিত্র আসছেন।
--কেমন আছো প্রতীক ?
প্রতীকের দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
--কি হল কাঁদছো কেন ? কি ভালো নেই ? কিছু অসুবিধা আছে ? প্রতীক নীলাক্ষীর কোভিড পেশেন্ট। রোজ প্রতীককে দেখতে আসে, এখন তো অনেকটা ভালো আছো প্রতীক, তবে কেন কাঁদছো বল আমায় ? কি অসুবিধা ? কাঁদলে তো আমি বুঝতে পারব না, বল প্রতীক ! তুমি এখন অনেকটা ভালো আছো।
নীলাক্ষী দেখল, প্রতীকের শারিরীক কোন অসুবিধা নেই। একটু দুর্বল, ওকে দুদিন পরে ছেড়ে দেবে।
বারবার জিজ্ঞাসা করার পরেও প্রতীক কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে কাঁদতেই থাকলো। নীলাক্ষী বেরিয়ে এল। ডাক্তার নীলাক্ষী নার্স মাধুরীকে বলল, এখন প্রতীক ঠিক আছে। কথা কটি বলে নীলাক্ষী বেরিয়ে গেল। নার্স ডাক্তারের সাথে সাথে যেতে যেতে বলল, ম্যাডাম শুনেছি প্রতীকের বাবা-মা দুজনেই কবিডে মারা গেছে।
নীলাক্ষী বলল, এবার তো অনেকেই নিজের আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়েছে। দুদিন পর প্রতীক ছুটি পেয়ে যাবে।
নীলাক্ষী বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ প্রতীককে রাস্তায় দেখতে পেল। প্রতীক রাস্তার পাশে গাছের নিচে একটা পাথরের উপর বসে আছে। নীলাক্ষী গাড়ি থামিয়ে প্রতীকের কাছে গেল। প্রতীককে জিজ্ঞাসা করে, তুমি এখানে কেন বসে আছো প্রতীক ?
প্রতীক চুপ করে বসে থাকল, কোন কথার জবাব দিল না। যেন সে একটা প্রস্তর মূর্তি। নীলার মনে পড়ল ওর বাবা-মা দুজনেই মারা গেছে, নার্স বলেছিল। নীলা একটু ঝুঁকে প্রতীকের কাঁধে হাত রেখে বলল, উঠে এসো প্রতীক, আমার সাথে যাবে চলো।
নীলা প্রতীককে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো। বাড়িতে বুড়িমা প্রতীককে দেখে বলল, তোমার নাম কি বাছা ? নীলাকে বলল, আবার কাকে নিয়ে এলি তুই ?
নীলা বললো, মা ছেলেটিকে স্নান করতে দাও, বিধু দাদাকে বলো, ওর কোভিড হয়েছিল, ওকে ভালো করে স্নান করাতে বলো। ওকে খেতে দিতে বলো। তুমি যাবে না ওখানে, অবশ্য প্রায় এক মাস হয়ে গেছে, এখন ও ঠিক আছে, বলে, নীলা নিজের ঘরে ফ্রেশ হতে চলে গেল। নীলা দেখল বিধু দাদার পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে প্রতীককে খুব সুন্দর লাগছে।
নীলা দেখল, প্রতীক নিজের মা-বাবার বিয়োগব্যথা এখানে থেকে বেশ সামলে উঠেছে। নীলা প্রতীকের খুব খেয়াল রাখে। প্রতীকের প্রতি কিছুটা সহজ হয়ে উঠেছে। প্রতিক এক সকালে বলল, আমি এখন ভালো আছি, নীলা, ভাবছি নিজের ঘরে চলে যাব, আমি তোমার নাম ধরে বলে ফেলেছি, কিছু মনে করো না--
নীলা বললো, আমি খুব খুশি হয়েছি, প্রতীক নিজের বাড়ি গেল।
বাড়িটা কেমন খা খা করছে, প্রতীকের একেবারেই ভালো লাগছে না। মাসিমা, বিধু দাদা, নীলা সবাই আছে ওখানে। আমার আর এখানে ভালো লাগে না।
সকাল হতেই প্রতীককে দেখতে পেয়ে নীলাক্ষী বলল, এখানেই থাকো না কেনো ? মা বললো তোমার জন্য মারও চিন্তা হয়, খাওয়া-দাওয়া করলে কিনা--
বিধু দাদা বলল, তুমি থেকে যাও দাদাবাবু !
প্রতীক থেকে গেল। ওখানেই নীলার সাথে বাজারে যাওয়া ঘুরতে যাওয়া পুজো দেখা এমনি করে প্রতীক বেশ সহজ হল। ওরা বুঝতে পারল না ওদের কখন যেন প্রেম হয়ে গেছে। প্রতীক নীলার প্রেমের আভাস পায়। প্রতীক নিজের চাকরি খুঁজতে বের হয়--সকালে বের হয়, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। এমনি রোজ রোজ চলতে থাকে, নীলা কতদিন ধরে লক্ষ্য করছে প্রতীক খুব রোগা হয়ে যাচ্ছে। নীলা বললো, প্রতীক তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কোন শরীর খারাপ হয়নি তো ?
--কি বলছ নীলা, আমি তো দিব্যি আছি--
নীলা বললো, না, তুমি দিব্যি নেই, নিজের দিকে খেয়াল রাখো। পরদিন নীলা রাতে প্রতীকের ঘরে এলো। প্রতীকের গায়ে হাত রেখে বলল, প্রতীক তোমার গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে--
--ও কিছু না--আজ রোদে ঘুরে ছিলাম তাই--
নীলা বলে, না না, বেশ জ্বর তোমার--দাড়াও আসছি, বলে, নীলা ছুটে বেরিয়ে গেল। এক গ্লাস জল ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। জলপট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানোর পরেও জ্বর নামল না। দুদিন পরে হসপিটালেএডমিট করতে হল প্রতীককে। হাসপাতালে দেখাশোনার ভার নীলাই নিল।
কদিন হয়ে গেছে প্রতীকের জ্বর নাচছে না। নীলা চিন্তায় পড়লো। সিনিয়র ডাক্তার এলো। সব রকম পরীক্ষা হল, নীলা চিন্তায় পড়েছে। নীলার হাত ধরে থাকে প্রতীক। জ্বরের ঘোরে খালি মা মা বলে। পরদিন রিপোর্ট এলো। প্রতীকের ক্যান্সার হয়েছে। নীলা যা ভেবেছে, তাই, প্রতিক অপারেশনের সময় দিল না--রাতে ধুম জ্বর--প্রতীক চুপ করে শুয়ে থাকলো। সকালে সে সুদূর আকাশ পাড়ি দিলো।
এত রোগীকে মরতে দেখেছে নীলা--এমনি মন খারাপ হয়নি তার। এবার নীলা রুদ্ধশ্বাসে কেঁদে উঠলো, হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। সে যে প্রতীকের খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিল।
সমাপ্ত

সন্ধ্যা রায় প্রচারবিমুখ একজন লেখিকা। ভালো লেখেন। বর্তমান লেখাটিও পড়ে আমার খুব ভালো লেগেছে।
ReplyDeleteভীষণ ভালো লাগলো, শুভেচ্ছা রইলো
ReplyDelete