পাথরের চোখ
শংকর ব্রহ্ম
-------------------
লোকটা আমাদের দপ্তরেই চাকরী করত। মাস কয়েক আগে জয়েন করেছে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কারও সঙ্গে মিশত না, কথা বলত না। কারও সাথে পাছে থাকত না। একা একা ক্যান্টিনে গিয়ে টিফিন করত। তার সম্পর্কে মেয়েদের কৌতূহল ছিল অপার।
আমরা অফিসে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কত কথা বলতাম, রাজনীতি, খেলা,সিনেমা, বইমেলা নিয়ে আলোচনা করতাম। সে থাকত নীরব। যতবার তার চোখের দিকে তাকিয়েছি,দেখছিপাথরের চোখ, ভাষাহীন। মেয়ে মহলে তার প্রসঙ্গে উঠলে, বদ্বুদের মতো উঠেই মিলিয়ে যেত। কারণ কেউ তার সম্পর্কে বেশী কিছু বলতে পারত না।
কখনো সখনো সে আমার হাতের বই বা পত্রিকা চেয়ে নিয়ে পড়ত। কিন্ত তার সম্পর্কে কখনও কোন মন্তব্য করত না।
তাকে দেখে আমার মনে হত, গোবেচারা স্বভাবের ভাবলেশহীন মানুষ এক। যার
আমাদের কারও সম্পর্কে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই ।
অফিস ক্যান্টিনে ভেঙে নতুন করে গড়া হচ্ছে।
অনেকেই নিজের টেবিলে চা আনিয়ে খাচ্ছে।
কেউকেউ ভাঙা ক্যান্টিনের আসে পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। লোকটিও একপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কিছু দূরে দাড়িয়ে আমি, একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে, হাতের পত্রিকাটা খুলে দেখছি। চা খেতে খেতে সে ওই পত্রিকাটি একবার দেখতে চাইল আমার কাছে। দিলাম। হাতে নিয়ে নববিবাহিতদের পাতায় একটি ছবি দেখে, তার হাত থেকে চায়ের কাপটি পড়ে গেল।
সেও ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। আমরা হৈ চৈ করে তাকে তুলে এনে অফিসে পাখার নীচে এনে শোয়ালাম। চোখে জলের ঝাপটা দিতে, কিছুক্ষণ পরে তার জ্ঞান ফিরে এলো। সে উঠে বসলো। আমরা বললাম,আপনার শরীর ভাল নেই, আপনি আজ বাড়ি চলে যান।
-ঐ পত্রিকাটি একটু নেবো?
-নিন
-ওর থেকে একটা ছবি কেটে নেবো?
-কেটে নিন। পত্রিকটাই নিয়ে যান বাড়ি।
সে পত্রিকাটি নিয়ে চলে গেল সেদিন।
পরের দিন সে আর অফিসে আসেনি। তারপর দিনও না। মাসখানেক পরে শুনলাম,তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।
তার কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। জীবনে কত লোকের
সঙ্গে আলাপ,পরিচয়,হৃদ্যতা হয়,
কিন্তু ক'জনের কথাই বা মনে থাকে বলুন?
কয়েকমাস পর পোষ্ট অফিস থেকে একটি চিঠি আসায়, তার কথা আবার মনে পড়ল।
তিনি লিখেছেন,আপনার কাছ থেকে যে পত্রিকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর ছবি ছিল। ছবিতে তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, ছবিতে তার সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় না। যার চোখে কবিতার ভাষা আছে সে বুঝবে ,ক্যামেরার চোখে তো আর তা নেই।
তার এই সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত কাল হলো।
প্রতিবেশী এক তরুণ কবি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে, আস্ত একখানা প্রেম উপখ্যান লিখে ফেললো। সেটা আবার টাকা খরচ করে ছাপিয়ে তাকে উৎসর্গ করলো।
আশ্চর্য, সেও সেই তরুণ কবির প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। পাগল হয়ে উঠল। কিছুদিন আমি তা লক্ষ্য করে বুঝতে পেরে, প্রথমে খুব কষ্ট পেলাম।
পরে ভাবলাম যে আমাকে ভালবাসে না তাকে ভুলে থাকাই ভাল। তাই আমি তাকে মিউচুয়ালি ডিভোর্স দিলাম।
গত মাসের সাতাশ তারিখে তার আবার নতুন বিয়ে হয়েছে ওই তরুণ কবির সাথে। তারই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ওই পত্রিকায়।
চিঠিটা পড়ে আমার চোখে,তার ভাবলেশহীন পাথরের চোখ দু'টো ভেসে উঠলো। চোখ দুটো থেকে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে আমার হাতে পড়ল মনে হলো। না হলে হাতটা আমার আর ভেজা কেন? আমি তো আর কাঁদিনি, তার দুঃখে অশ্রুসিক্ত হয়ে।

পাথরের চোখ গল্পটা পড়ে বেশ ভালো লাগলো। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।
ReplyDelete