Saturday, 3 July 2021

স্মৃতি শেখর মিত্র






লোকটা

স্মৃতি শেখর মিত্র  


এক টুকরো জমি নিয়ে খেলা করে লোকটা। আমাদের বাড়ির পাশে। সঙ্গে থাকে একটা কোদাল তার হাতলটা অনেক বড়। সেই কোদাল নিয়ে কোপায় তার জমির ওপর বেড়ে ওঠা ঘাস আর আগাছা।কারও সাথে কোনদিন কেউ কথা বলতে দেখেনি ওকে। পরনে একটা ফতুয়া আর হাফপ্যান্ট ।হাতে একটা লম্বা টিফিন ক্যারিয়ার । দিনের খাবারটা ঘর থেকেই সাথে করে নিয়ে আসে।ওর মুখে প্রায়শই একটি আধখাওয়া বিড়ি দেখতে পাই।

ও যে সময় নিজের জমিতে আসে আমি সে সময় আমাদের ব্যালকোনিতে বসে মানুষদের আসা যাওয়া ইত্যাদি উপভোগ করি। আমাদের ফ্ল্যাটের এক কিলোমিটারের মধ্যে দু তিনটি বড় বড় পার্ক আছে। সুবিধা থাকায় এখানকার বেশিরভাগ মানুষই সকাল দিকটা কিছু সময় শরীর চর্চায় ব্যস্ত থাকেন।সে যাইহোক লোকটা জমিতে পা দিয়েই কোদাল দিয়ে ঘাস ও আগাছা পরিষ্কার করা শুরু করে দেয়। এটাই তার একমাত্র কাজ। জমিটির ওপর একটা কাঠের বোর্ড লাগানো আছে খুব সম্ভব কর্ণাটক সরকারের ব্যাঙ্গালোর কোর্ট থেকে নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে।" এই জমি বিক্রয় যোগ্য নয়।" লোকটাকে দেখলে মনে হয় আশির কাছাকাছি বয়স। অতিশয় শীর্ণকায়। আমাদের বাড়ির সকলেই ওর কান্ডকারখানা দেখে হাসি মস্করা করে।


আমরা যে জায়গায় থাকি সেটি হচ্ছে গৌরব নগর জয়প্রকাশনগরের একটি অংশ। লোকটির জমির লাগোয়া একটি বিশাল ক্লাব তৈরি হয়েছে Reliance Sports Club এখানে রিলায়েন্স কোম্পানি ব্যবসার খাতিরে এই ক্লাব বানিয়েছে। বড় বড় কোম্পানির সাহেব, মেমসাহেব ও তাদের ছেলে মেয়েরা প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় এই ক্লাবের ভেতরে টেবিল টেনিস, ব্যাটমিন্টন ইত্যাদি ইনডোর

গেমস্ খেলে সেই সুবাদে এখানে মানুষের ও গাড়ী ঘোড়ার ভিড় লেগেই থাকে। এছাড়া লোকটির জমিটির সামনে কয়েকশ' কোটি টাকার প্রোজেক্টে বানানো হয়েছে  " বিগ্ৰেড গার্ডেনিয়া"নামে এক বিশাল হাউসিং কমপ্লেক্স। যেখানে প্রায় হাজার খানেক ফ্ল্যাট।এর ভেতরের প্রতিটি এপার্টমেন্ট চোদ্দো তালা উঁচু। তাই ঐসব এপার্টমেন্টের উপর থেকে পুরো ব্যাঙ্গালোর শহরটি দেখা যায়। আর ওর জমির একপাশে আমাদের এপার্টমেন্ট।

ওর জমির পাশ দিয়ে গেছে ষোল ফুট চওড়া রাস্তা। দুপাশে আরও অনেক কটি এপার্টমেন্ট। নিকটেই একটি খুব বড় ইংরেজি মাধ্যম স্কুল।সেসব কারণে লোকটির জমিটির গুরুত্ব খুব বেশী  এবং এখানকার সব বড় বড় প্রমোটারদের জমিটির ওপর বিশেষ নজর আছে।জমিটিও বর্গাকৃতি বেশ কয়েক কাঠা জমি হবে। কিন্তু সরকারের আদেশানুসারে জমিটি ক্রয় / বিক্রয়যোগ্য নয় তাই জমিটি এখনও অক্ষত অবস্থায় পড়েই আছে। জমিটির বর্তমান বাজার দর কয়েক কোটি টাকা

হবে। লোকটি সকালে নয় বলতে গেলে ভোর বেলাতেই চলে আসে। শুনেছি লোকটির বাড়িও এখান থেকে এক দু কিলোমিটার দূরে। কারণ ব্যাঙ্গালোরে ভালভাবে রোদ উঠতে প্রায় সাড়ে সাতটা আটটা বেজেই যায় এবং সন্ধ্যাও হয় অনেক দেরিতে।ওকে আমরা সকাল থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত শুধু ঘাস ও আগাছা উপড়াতেই দেখি।

জমিটির চারিদিকে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা। কোন দিন কোন অর্থকরী ফসল বা তরিতরকারি চাষ করতে দেখিনি। সেজন্য এক দিকের ঘাস সাফ করতে করতে অন্য দিকের ঘাস আবার বেড়ে উঠে।যে কারণে ওর মনে রাগ তো হয়ই না বরং আনন্দ হয়। এভাবে ওর সারা বছরের কাজের সুযোগ থেকেই যায়।ব্যাঙ্গালোরের একটা বিশেষত্ব হলো এখানে হঠাৎ হঠাৎ বিকেল কিম্বা সন্ধ্যার দিকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয় এবং এমন জোর বৃষ্টি হয় যে ব্যালকোনিতে মেলা কাপড় চোপড় ওঠানোর সময়ও পাওয়া যায় না। প্রতিদিন বিকেলে বৃষ্টি হয় বলে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে সে আসে না। লোকটি সন্তান বা আত্মীয় স্বজনদের থেকেও মনে হয় বেশি ভালবাসে তার জমিটাকে। যেন একটা বিশেষ মায়া পড়ে গেছে জমিটির ওপর। যে জমি থেকে এক পয়সাও রোজগার নেই তার পেছনে এত পরিশ্রম করার কি কারণ তা আজ অবধি আমাদের বোধগম্য হলো না। হতে পারে জমিটা যে তার একান্তই নিজের তার নিজের কাছে নিজেই প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিষ্ফলা জমিটিতে রোজ চার পাঁচ ঘণ্টা কোদাল কোপায়। জমির মায়ায় এমনিভাবেই হয়তো জমিতেই প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে।


সমাপ্ত

4 comments:

  1. আসলে মাটি খাটি। মানুষ যতই সভ্যতার শিখরে উঠুক না কেন মাটির সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে জীবন কখনোই চলতে পারে না। সিটি শেখর মিত্রের এই গল্পটি পড়ে ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  2. সাবিত্রী দাস12 July 2021 at 07:07

    প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির মাঝেই জীবন যৌবন অতিবাহিত ,প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার জীবন। কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় নয় এরা আজো বেঁচে থাকার আনন্দেই বাঁচে। লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

    ReplyDelete
  3. সাবিত্রী দাস12 July 2021 at 07:12

    লেখককে ধন্যবাদ জানাই, প্রকৃতির মাঝে সবুজের সাথে জীবনের প্রথম থেকে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত বেঁচে থাকার আনন্দেই বাঁচতে চাওয়াতেই তুলে ধরার জন্য।

    ReplyDelete
  4. সাবিত্রী দাস12 July 2021 at 07:18

    লেখককে ধন্যবাদ জানাই, এরকম একটি গল্পের জন্য। মাটির সাথে, প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে বাঁচতে চাওয়াতেই যে প্রকৃত আনন্দ, এই অনুভূতিটুকুর জন্যই গল্পটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

    ReplyDelete

অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে

  অণুগল্প পত্রিকা বর্ণালোকের সম্পাদক কলমে-- মানুষের জীবন থেকে টুকরো টুকরো করে সাজিয়ে বোধহয় তৈরি হয় গল্প। অবশ্য শুধু মানুষকে নিয়ে কেন, প্...