তমা কর্মকার
সেদিন তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো,মেট্রো ট্রেনে প্রায় বাইশ বছর পরে,আমি ছিলাম কর্নারের সিটে বসে তুমি ছিলে ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আমি ছিলাম একটু অন্য মনস্ক, তাই আমি তোমাকে প্রথমে দেখতে ও চিনতে পারিনি,তোমার সৌম্য কান্তি চেহারায় পড়েছে বয়স কালীর ঝুল, চোখে উঠেছে মোটা সোনালী ফ্রেমের চশমা চুলে ধরেছে অল্প বিস্তর পাক, হঠাৎ তোমার এই শোন্ ডাকটায় একলহমায় একটু চমকে সামনের দিকে তাকিয়ে আমার ঠিক সামনেই দাঁড়ানো অবস্থায় তোমাকে দেখতে পেলাম, তোমার দিকে তাকিয়ে তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে তোমাকে না চেনার ভান করে বললাম হুম আমাকে ডাকছেন? তুমি আমার কথায় একটু অবাক হয়ে বললে তুলি তুমি কি আমায় চিনতে পারছোনা? নাকি একেবারেই ভুলে গেছো?নাকি???
আমি তোমার কথাটা শুনতে শুনতে মুহূর্তে মনের কোণে হারিয়ে গেলাম তোমার ছেড়ে যাওয়া স্মৃতির অন্তরালে |তুমি আবারো ডাকলে আমায় এই শুনছো?আমার স্মৃতির জাল ছিঁড়ে গেলো আমি তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে বললাম, তুমি ঠিকই বলেছো আমি তোমায় চিনতে পারিনি, তা কোথা থেকে উঠলে ট্রেনে আর উঠলে তো উঠলে এতো বছর পরে এসে দাঁড়ালে তাও আবার আমারই সামনে, তুমি স্বভাব সিদ্ধ মুচকি হেসে আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বলে উঠলে, কেমন আছো তুমি?তোমার স্বামী কি করেন?ছেলে মেয়ে কটি?আমি তোমাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম আরে দাঁড়াও দাঁড়াও এতো প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দেব কিভাবে? তারপর একটু থেমে বললাম তোমার কথার জবাবে বলি আমি খুব ভালো আছি আমার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারী আমার একটি কন্যা সন্তান তার নাম মেঘা, হঠাৎ দেখলাম আমার কথা শুনে তোমার মুখটা মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেলো, ইতিমধ্যে আমার পাশের সিট্ টা খালি হওয়ায় তুমি ধপ করে সে সিটে বসে পড়লে,মাথা নিচু করে আমার কথা শুনে,তোমাকে অমন করে বসে পড়তে দেখে আমার মনে যেন এক তৃপ্তি পেলাম মুহূর্তে,হাজার নারীর সাথে করা এক পুরুষের এক অন্যায়ের যোগ্য শাস্তি দিতে পেরে মনটা ভরে গেলো পরম শান্তিতে |ইচ্ছে হলোনা তোমার কাছে জানতে যার জন্য তুমি আমাকে দীর্ঘ বাইশ বছর আগে ছেড়ে গিয়েছিলে সে কেমন আছে? বা তোমার ছেলে মেয়ে হয়েছে কিনা? তোমার করুন মুখটা দেখে আমার একবারও তোমাকে করুনা করে বলতে ইচ্ছে হলোনা মেঘা তোমার আমার ভালোবাসার সেই স্বপ্ন যা আমরা কোনো এক একান্তের আবেগঘন মুহূর্তে দেখেছিলামএকসাথে |মেঘা সেই মেয়ে যাকে আমার গর্ভে রেখেই তুমি নতুন মুখ ও নতুন সুখের সন্ধানে করেছিলে নতুন পথের পরে প্রস্থান আমি আজও স্বপ্নের স্বামী বুকে আগলে সিঁথি সীমান্ত রাঙিয়ে পড়ি লাল টকটকে সিঁদুর, না আজ আমি কোনো কল্পনার স্বামীর পরিচয়ে পরিচিত নয় আজ আমার তৈরী হয়েছে নিজস্ব পরিচয়,আজ আমি কবি সাহিত্যিক গীতিকার,নাট্যকার আমার এক একটি বই হাজার হাজার টাকায় হয় বিক্রি, এছাড়াও আজ আমার আরো একটা পরিচয় আছে,আমি বিমান সেবিকা মেঘার আদর্শময়ী মা আজ বিভিন্ন পত্রিকার পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে আমার একটি লেখা পাওয়ার জন্য প্রকাশকদের লাইন পড়ে বাড়ির সীমানা জুড়ে,না তোমাকে আর কিছুই বললাম না তোমার নিচু মাথাটা দেখতে দেখতে আমার নির্দিষ্ট স্টেশন এসে গেলো আমি আসি বলে নেমে গেলাম মেট্রো ট্রেনটা তোমাকে নিয়ে ছুটে চললো তার নির্দিষ্ট গন্তব্য পথের দিকে আমি দীর্ঘ বাইশ বছর পর মনের খুশি ও হালকা ফুরফুরে মেজাজে চললাম আমার নতুন ফ্ল্যাট সুখীনীড়ে |

গল্পটা পড়ে ভালো লাগলো
ReplyDelete